সোমবার, ১৫ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

উন্নয়নের রোল মডেলে মুহিত

উন্নয়নের রোল মডেলে মুহিত
  • দেশে ১২ বাজেট ঘোষণা
  • ৩৭ বছরে বৃদ্ধি ৯৮ গুণ

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বাংলাদেশের ১১তম জাতীয় বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। সেই বাজেটটি ছিল সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে। তিনি এরশাদকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে রাজনীতিতে অংশ নেন। দেন দুটি বাজেট। এরশাদ কথা না রাখায় আবার ফিরে যান চাকরীজীবনে। দেশের ৪৭তম ও তার শেষ বাজেট দেন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই অর্থমন্ত্রী গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

মুহিত ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে শুরু করেন যা শেষ করেন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট দেয়ার মাধ্যমে। দুটি সরকারের অধীনে ৩৭ বছরের ব্যবধানে তিনি বাজেট দুটিতে ৯৮ গুণ বৃদ্ধি করেন। তা ছাড়া দেশের ইতিহাসে ১২টি বাজেট ঘোষণা করেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বেশি বাজেট ঘোষণা করেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শাসনামলের অর্থমন্ত্রী মো. সাইফুর রহমান ১২টি ও আওয়ামী লীগের শাহ এ এস এম কিবরিয়া দেন ৬টি বাজেট। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তিনজন অর্থমন্ত্রী একটি আসনেরই ছিলেন।

এরশাদের হাত ধরে আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরের দেয়া দেশের ১১তম বাজেটটি ছিল ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা ও ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে ১২তম বাজেট ছিল ৫ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকার। দুটি বাজেট ঘোষণার পর তিনি এরশাদের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে মহাজোটের পক্ষে সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে ৬ জানুয়ারি তাকে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এ সময় তিনি দেশের ৩৮তম বাজেটটি ঘোষণা করেন। ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটটি ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আওয়ামী লীগের দুই কারণে তিনি টানা ১০ বার বাজেট পেশ করেন।

আরও পড়ুনঃ  ‘মোবাইল বেশি দেখার কারণে মানসিক সমস্যা বাড়ছে’

২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। তিনি দেশের ৪২তম বাজেটে ২ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেন। এই ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬, অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। দেশের ৪৫তম বাজেটে তিনি প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে হৈচৈ ফেলে দেন। এ বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট দেন তিনি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ এম এ মুহিত-৪ লাখ ২৭০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। দেশের ৪৭তম ও তার ব্যক্তিগত ১২তম বাজেটটি ছিল ২০১৯-১৯ অর্থবছরের। এটির আকার ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।

মুহিতের হাত ধরেই জিডিপি প্রবৃদ্ধির রেকর্ড করে। ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.০১ শতাংশ। তা ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর তা দাঁড়ায় ৮ দশমিক ১৫ শতাংশে। মুহিত অর্থমন্ত্রী পথ থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ গতি লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষে ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। করোনার কারণে সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য করা গেছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় ভালো।

আরও পড়ুনঃ  দাবানলে বিপর্যয়ের মুখে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসায়ীরা

মুহিত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি মুহিতের সময়কালে না হলেও তার সময়কার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিতে এ স্বীকৃতি মিলেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেস ওয়ে, মেট্রোরেলসহ দেশের সব মেগা প্রকল্পের কাজ মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকার সময় শুরু করেন। এসব প্রকল্পের কাজ এখন দৃশ্যমান।

১৯৩৪ সালের ৬ অক্টোবর অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন শ্রীহট্ট বর্তমান সিলেটে জন্ম নেন আবদুল মুহিত। তার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬০ সালে। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। টানা ৯ বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করার পর আমেরিকায় তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগ দেন। চাকরিরত অবস্থায় পাকিস্তান কর্মপরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপসচিব ছিলেন। এ সময় তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেন এবং পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসে পেশ করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তাকে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মুহিত। ১৯৮১ সালে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন মুহিত। ১৯৮২-৮৩ সালে এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশন, বিশ্বব্যাংক, আইডিবি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থাসহ (ইফাদ) জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আরও পড়ুনঃ  নিষেধাজ্ঞা বাড়লো ৪ নভেম্বর পর্যন্ত

প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ. বি. মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, আবুল মাল আব্দুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাকালে দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের নিচে রাখায় বৈদেশিক ঋণের সীমাও কম ছিল। তার দূরদর্শিতার ফলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালি হয়েছে। দারিদ্রের হার কমেছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। অসহায়-গরীবরা সহযোগিতা পেয়েছে। তার জীবনটি ছিল সাফল্যমণ্ডিত।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন