নদীকে তার গতিতে চলতে দিতে হবে। বন্যা সবসময় খারাপ নয় অনেক ভালো কিছুও সেখানে থাকে। আমরা নদীকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক, জলবায়ু, সামাজিকসহ সবক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর ‘বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন: অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির আগারগাঁওস্থ নিজস্ব কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় ড. শামসুল আলম বলেন, বাংলাদেশ ডেল্টা প্লানের বিষয়ে ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী ১০০ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনার চিন্তা করেন। সে নিয়েই এটি ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ হয়। সেটিতে সকলের চিন্তা-ভাবনাকে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিগত পানিব্যবস্থায় বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়নি ডেল্টা প্লানে এটি ঠিক নয়। সেখানে আর্থ-সামাজিক, পানিব্যবস্থা ও অন্যান্য বিষয়টিও প্রধান্য দেয়া হয়েছে।
ড. শামসুল আলম বলেন, অর্থনীতিবিদরা এটিতে মতামত দিয়েছেন। তারা দেশে-বিদেশে কাজ করেছেন। ডাচ এ্যাম্বাসিকে যুক্ত করা হয়েছিল। তারা প্রজেক্ট বাতিল করতে চেয়েছিল। আমরা তাদের ড্রাফটি মূল্যায়ন করিনি। এ নিয়ে অনেক মান-অভিমানের অবস্থা সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, প্রতিবছর ৫৫ হাজার পরিবার নদীভাঙনে গৃহ হারান। এই সমস্যা আমাদের আহত করে। আমরা প্রকৃতিতে তার রুপে থাকতে দিয়েছি। এখানে তাকে বাগে এনে কাজের চিন্তা করা হয়েছে। ডেল্টাতে নদীভাঙন ঠেকাতে ৮০টি প্রজেক্ট নেয়া হয়েছিল তার মধ্যে ১৭টি বাস্তবায়ন হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগামী দিনে ডেল্টা প্লানেই যেতে হবে। এটি প্রয়োজনে সংশোধন করা হবে।
ড. শামসুল আলম বলেন, প্রতিটি নদীকে তার পথে চলতে দিতে হবে। যমুনার প্রবাহ ১২ মাইলে আনা যেতে পারে। দেশের প্রতিটি নদীকে ড্রেজিং করা হবে। ১৩৯ ফোল্ডার উন্নয়নে কাজ করছে। সেখানে অনেক ফসল উৎপাদন হয়।
তিনি বলেন, ফাইবার প্লানিং এর মাধ্যমে ডেল্টা প্লান বাস্তবায়ন করা হবে। এখানে এসডিজি, এমডিজি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যারা ১০০ বছরের প্লান করেছে।
ফারাক্কা বাঁধ বিষয়ে ড. শামসুল আলম বলেন, এটি ভারতের বিষয়, সেখানে আমরা কথা বলতে পারি না।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, এমপি। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের প্রধান ড. এস. নজরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বুয়েট) ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফুড ম্যামেজমেন্ট বিভাগের প্রফেসর সুজিত কুমার বালা প্রমুখ।
ড. নজরুল ইসলাম বলেন, নদী নিয়ে কাজ করতে হলে কিছু সময় নিয়ে করলে হবে না। এটি নিয়ে বিশদ কাজ করতে সময় প্রয়োজন। মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। হুটহাট প্রকল্প নিলে দেশ খারাপের দিকে যাবে। ডেল্টা প্লান পুরো বাতিল নয় কিছু অংশ সংশোধন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বোরো সফল আমাদের প্রধান ফসল নয়। আমন প্রধান মৌসুম হলেও সেটি পাল্টে গেছে। এটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বর্ষা মৌসুমের ফসল নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে।
ডিএনই প্রজেক্ট নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ড. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রকৃতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নদীর পানি দূর থেকে না এনে স্থানীয় পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
গঙ্গা নদী ভারতের ভিতর দিয়ে গেছে দেখে আমরা বলতে পারবো না? আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে কেন কথা বলা যাবে না বলে প্রতিমন্ত্রীর কথার সমালোচনা করেন ড. নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ফারাক্কার সমস্যা কেন ডেল্টা প্লানে বলা হলো না? এটি তো আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। দেশের মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। এটির ৫০ বছর বয়সেও কোন রিভিউ করা হচ্ছে না। এটি নিয়ে কথা বলতে হবে। আমাদের ক্ষতি নিয়ে আমরা কথা না বললে কে বলবে? প্রকৃতিকে তার গতিতে চলতে দিতে হবে। তা না হলে আমাদের পস্তাতে হবে। নদীর সাথে সবার ভাগ্য জড়িত। এটিকে হেলায়-ফেলায় ফেলে দেয়া হবে না।
প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান বলেন, পাকিস্তান আমলে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বন্যা। তখন বন্যা নিয়ন্ত্রণই ছিল অন্যতম কাজ। কেননা প্রায় প্রতিবছরই বন্যার কবলে পড়তে হতো।
ড. বিনায়ক সেন বলেন, আমরা বর্ষা মৌসুমে ফসলের বিষয়ে কি চিন্তা করছি। কেননা আমরা শুষ্কনো মৌসুমের উৎপাদন নিয়ে খুবই প্রচার করে থাকি।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বহ্মপুত্রের চীনের তিনটি ড্যাম ও ভারতের ড্যাম নিয়ে সরকারের কি কার্যক্রম বিষয়টি খোলাসা করা দরকার। তিনি বলেন, বইটিতে এ নিয়ে তথ্য নেই।
রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, পলিসি ল্যাবেলে কনসিয়ানসেস থাকে সেগুলো কেন বাস্তবায়ন হয় না। টিআরএম নিয়ে স্থানীয় লোকদের সমস্যা হয়। সরকার কেন এখানে হাত দেয়া হয় না।
অধ্যাপক সাজিদ কামাল বলেন, বইটি বাংলা করা প্রয়োজন। ডেল্টা প্লান বা বিশদ অঞ্চলের পরিকল্পনাটি কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন।
ড. জিল্লুর রহমান বলেন, গ্রামীণ ৭৫ শতাংশ মানুষের জন্য কি চিন্তা করা হয়েছে? গ্রামের মানুষ বন্যায় যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নিয়ে একটি পরিকল্পনা করা দরকার।
ড. বিনায়ক সেন বলেন, নদী না থাকলে আমরাও থাকবো না।
আরো বক্তব্য রাখেন ড. কাজী শাহাবুদ্দীন বলেন, অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, ড. মহিউদ্দীন আলমগীর, ড. জিল্লুর রহমান।
আনন্দবাজার/টি এস পি




