৩৫৮ কোটি টাকা দায় নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের যাত্রা শুরু। ১৯৮২ সালে এসে ব্যাংকখাতে নতুন মাত্রা যুক্ত করে বেসরকারি ব্যাংক।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকায় উল্লাসে মেতে উঠেছিল যখন সবাই তখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা ছিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেউলিয়া’। যুদ্ধকালীন অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে গোটা দেশ। সেখান থেকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পথ ছিল বহুদূর। গেল কয়েক দশকে দেশের আর্থিক খাতের বিকাশ ঘটেছে বিস্ময়করভাবে। নানা সংকটের মধ্যেও এই অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক খাত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাব থাকলেও নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে এই খাতটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
সূত্রমতে, ১৯৭২ সালে সামান্য ৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন থেকে ২০২০ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করা হয় ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। প্রথম বাজাটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। আজ ৫০ বছর পর দেশের প্রথম সেই বাজেটের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার বেড়েছে ৭৬৭ দশমিক ০৪ গুণের বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। যা ব্যাংকিংখাতের হাত ধরেই সম্ভব হয়েছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘স্টেট ব্যাংক অফ পাকিস্তান’র ঢাকা শাখাকে বাংলাদেশ ব্যাংক নাম দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে সরকার। ‘বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২’ পাস হওয়ার পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পথচলার শুরুটাই হয়েছিলো ৩৫৮ কোটি টাকা দায় নিয়ে। শুরুর এক বছরের মধ্যেই বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, কানাডা সরকারের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার মূল্যের সোনা কিনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে স্বাধীনতার ছয় মাসে ৯৫ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করা হয়।
স্বাধীনতার আগে মোট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ২২টি। এর মধ্যে তিনটি বিদেশি, পাঁচটি ভারতীয়, ১০টি পাকিস্তানি মালিকানাধীন, দুটি বাঙালি মালিকানাধীন এবং দুটি সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ-১৯৭২ অনুযায়ী পাকিস্তানি মালিকানাধীন ১০টি এবং বাঙালি মালিকানাধীন দুটি ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়। ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন ছিল বাঙালি মালিকদের; বাকিগুলো ছিল পাকিস্তানিদের। জাতীয়করণ থেকে বাদ দেওয়া হয় তিনটি বিদেশি ব্যাংক এবং পাঁচটি ভারতীয় ব্যাংককে।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা ও বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক নামে দুটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সরকার। পরের বছর ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন নামে আরো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৪ সালে স্থাপিত হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)।
দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালায় ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিশেষায়িত ব্যাংক। দেশের জনসাধারণের কাছে সঞ্চিত অর্থ জমাকরণ এবং জমা করা অর্থ উৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা গতিশীল করার জন্য ব্যাংকের শাখার পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয় সরকার। ১৯৭২ সালে বিভিন্ন ব্যাংকের মোট এক হাজার ১৬৯ শাখার মধ্যে শহর অঞ্চলের শাখা ৭৫৭টি এবং গ্রামাঞ্চলে শাখা ছিল ৪১২টি।
১৯৮২ সালে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এরপর থেকে শুরু করে বর্তমানে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক, ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক, তিনটি বিশেষায়িত ও নয়টি বিদেশি এবং অ-তালিকাভুক্ত পাঁচটিসহ মোট ৬৬টি ব্যাংক এবং ৩৪টি অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শাখা সারাদেশে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে। যুগের চাহিদা পূরণে ব্যাংক খাতে যোগ হয়েছে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন প্রযুক্তিভিত্তিক নানা রকম সুবিধাও।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে জাতীয়করণ, বেসরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের পাশাপাশি বহুজাতিক ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। বহুজাতিক ব্যাংকগুলো অন্যদের তুলনায় ভালো সেবা দিচ্ছে। তারা দক্ষ অপারেশনাল বিভাগ, ক্রেডিট বিভাগ, তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপণন বিভাগের সহায়তায় আরও ভালো গ্রাহক পরিষেবা, ব্যক্তিগত আর্থিক পরিষেবা, করপোরেট সুবিধা, বাণিজ্য পরিষেবাগুলি অফার করে। বর্তমানে ঘরে ঘরে সেবা, ইলেকট্রনিক ব্যাংকিংসহ ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা, ইন্টারনেট পরিষেবার মাধ্যমে বেতন এবং নগদ ব্যবস্থাপনা দেওয়ার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তাছাড়া, বাংলাদেশে বহুজাতিক ব্যাংকগুলির নিবিড় ই-ব্যাংকিং সেবা চালু করার অপেক্ষায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, উচ্চবিত্তসহ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে গেছে। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নজরদারির কারণে ঠিকভাবে চললেও রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব ও ঋণ খেলাপির করণে পিছিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে ব্যাংকগুলোতে। এ খাতকে এগিয়ে নিতে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
আনন্দবাজার/শহক




