শুক্রবার, ১২ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কারিগর সংকটে জামদানি

কারিগর সংকটে জামদানি
  • কৃষির জন্য সরকার ঋণ দিলেও জামদানি শিল্পে কোনো ঋণের ব্যবস্থা করেনি: শাহাদাৎ হোসেন শুভ, স্থানীয় বাসিন্দা
  • এমন সময় আসবে যখন জামদারির অনেক দাম থাকবে, তবে শাড়ি তৈরির কারিগর থাকবে না: আফজাল হোসেন, স্বত্বাধিকারী, আফজাল জামদানি হাউজ
  • বেশিরভাগ কারিগর আগের প্রজন্ম থেকে কাজ শিখলেও এখনকার কেউ আর কাজ শিখতে আগ্রহী নয়: ইব্রাহীম, কারিগর, বাবুল প্রধান জামদানি হাউজ
  • জামদানি শিল্পে সারাদিন কাজ করে যা পাওয়া যায় অন্য কাজে তার চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক মেলে: একেএম মুজাম্মিল হক মাসুদ, সিনিয়র গাইড লেকচারার, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন

বাংলার এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন জামদানি শিল্প। জাতিসংঘের সামাজিক উন্নয়নমূলক বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কো ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর এই জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে ঐতিহ্যবাহী জামদানি বিশ্বের স্বীকৃতি পেলেও অন্ধকার ঘোচেনি এই শিল্পের কারিগদের। নানা সংকট আর বঞ্চনার কারণে তারা আজ ভালো নেই। একদিকে কাজের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়া অন্যদিকে নতুন করে এই পেশায় জড়িত না হওয়ায় দিন দিন জামদানি হাউজের সংখ্যা কমছে। ফলে সোনারগাঁয়ের এই শিল্প তার সোনালি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

প্রাচীন বাংলার রাজধানীখ্যাত সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন জামদানি হাউজে সরেজমিনে গিয়ে তাঁতিদের মুখে দুর্দশার কথা শোনা যায়। জামদানি শাড়ি একসময় গর্বের বস্তু ছিল। আজও দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়। সোনারগাঁয়ের জামদানিই সবার কাছে শ্রেষ্ঠ বলে সমাদৃত হয়। তাঁতিদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় শাড়িতে ফুটে উঠে বাংলার প্রাকৃতিক ফুল, লতা-পাতা, বিভিন্ন প্রাণীর দৃশ্যসহ বাহারি নকশা। জামদানি শাড়ির প্রতি সবসময় নারীদের প্রবল আগ্রহও থাকে। তবে সবার মনের মধ্যেই হতাশা ক্ষোভ। 

আরও পড়ুনঃ  ঢাকাকে দূষণমুক্ত রাখতে ডিএসসিসির ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু

সোনারগাঁয়ের আফজাল জামদানি হাউজের মালিক আফজাল হোসেন হতাশার সুর ছড়িয়ে বললেন, এমন এক সময় আসবে যখন এই শাড়ির অনেক দাম থাকবে কিন্তু শাড়ি তৈরি করার কোনো লোক থাকবে না। তখন হয়তো জামদানি শাড়ি তৈরির যন্ত্রপাতিগুলো জাদুঘরে পড়ে থাকবে। কেউ এখন এটাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় না।

জামদানি শাড়ির কারিগর ও ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন আরও বলেন, ২০ বছর ধরে এই কাজ করছি। আমরা যারা এই শাড়ি তৈরি করি কেউই সঠিক মজুরি পাই না। তবে আমাদের কাছ থেকে কিনে যারা বিক্রি করছেন তারা ঠিকই লাভবান হচ্ছেন। ৫০০ টাকার একটি শাড়ি তৈরি করতে আমাদের এক সপ্তাহ লেগে যায়। এই দামের শাড়ি প্রতিমাসে সর্বোচ্চ ৪টা তৈরি করা সম্ভব হয় আমাদের। আর ২০ হাজার টাকার শাড়ি তৈরি করতে গেলে ৩ সপ্তাহ চলে যায়।

আফজাল হোসেন বলেন, বর্তমানে এই কাজ করে সঠিক মজুরি না পাওয়ায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে ছোটবেলা থেকে আমি এই কাজ করে আসছি। বর্তমানে যারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত তারা প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছেন। তাদের অন্য কোনো কাজের অভিজ্ঞতা তেমন নেই। এই শিল্পের খারাপ সময় যাওয়া সত্ত্বেও অনেকেই আবার মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ায় কারণে এই পেশা ছাড়তে পারছি না।

একই রকম দীর্ঘশ্বাস পাওয়া যায় বাবুল প্রধান জামদানি হাউজের কারিগর ইব্রাহীমের কথায়। তিনি জানান, ২৫ বছর ধরে এই কাজ করে আসছেন তিনি। তিনি যখন ছোট ছিলেন তখন তার মামা, খালারা এই কাজ করতেন। তাদের দেখে তার এই কাজে উদ্বুদ্ধ হওয়া। বর্তমানে এখানে ১৪ জন কারিগর রয়েছেন যারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সঙ্গে জড়িত। পূর্বে তাদের যে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো তা দিয়ে তখন তাদের সংসার চললেও এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। বেশিরভাগ কারিগর আগের প্রজন্ম থেকে এই কাজ শিখলেও এখনকার প্রজন্মের কেউই এই কাজ শিখতে আগ্রাহী নয়।

আরও পড়ুনঃ  ফ্রান্সে ফের লকডাউন

স্থানীয় বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন শুভ জানান, ৩-৪ বছর পূর্বেও জামদানি শিল্পের অবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল। তখন জামদানি শাড়ির চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সময় জামদানি শিল্পের খারাপ অবস্থা হয়। ওই সময়টায় তারা কোনো শাড়ি বিক্রি করতে না পারায় বেশিরভাগ কারিগররা এই পেশা থেকে সরে গিয়ে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে যায়।

আবার সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শাড়ির দাম বেড়েছে। এর ফলে শাড়ির চাহিদা অনেকটা কমে গেছে। এই তুলনায় কারিগরদের মজুরি তুলনামূলক বাড়েনি। এছাড়া এই কাজটা করতে অনেক ধৈর্য ও দক্ষ হতে হয়। যা সবার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠে না। অন্যসব পেশায় সর্বোচ্চ ৮-১০ ঘণ্টা কাজ করতে হয় কিন্তু এই পেশায় কারিগরদের ১৪-১৫ ঘণ্টা একটানা কাজ করে যেতে হয়।

শাহাদাৎ হোসেন শুভ আরও বলেন, আগে আমাদের এলাকার ঘরে ঘরে এই জামদানি শাড়ির কাজ চলতো। তখন পরিবারের সবাই একসঙ্গে আনন্দ সহকারে এই কাজটি করতো। কিন্তু এটি হারাতে বসেছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে ধরে রাখতে হলে সরকারের কিছু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কৃষির জন্য সরকার ঋণ দিলেও জামদানি শিল্পের জন্য এখনো কোনো ঋণের ব্যবস্থা চালু করেনি। এটি করলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা ভবিষ্যতের জন্য আরো ভালো কিছু করতে পারবে।

সোনারগাঁয়ের সাহিত্যিক, লেখক ছড়াকার সেলিম মিয়া জানান, সোনারগাঁ একসময় জামদানি শাড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে বিদেশি বিভিন্ন পোশাক এদেশে সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় জামদানি শাড়ির চাহিদা কিছুটা কমে গেছে। সরকার থেকে উচিত এই পেশায় যারা জড়িত তারা যেনো স্বল্পমূল্যে ঋণ এবং সঠিক মজুরি পায় সে ব্যবস্থা করে দেওয়া। এই কাজটা অন্যসব কাজের তুলনায় নিখুঁত এবং কষ্টসাধ্য। তাই নতুন কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। বর্তমানে যে সব তাঁতি আছে তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছে। তাদের দেখাদেখি বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এই পেশায় উদ্বুদ্ধ হয় না।

আরও পড়ুনঃ  কাতারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশি সবজি

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সিনিয়র গাইড লেকচারার একেএম মুজাম্মিল হক মাসুদ জানান, জামদানি শিল্পের মূল সংকট হচ্ছে কারিগর সংকট। এই পেশায় সারাদিন কাজ করে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পাওয়া যায় আর অন্য পেশায় কাজ করলে আরো বেশি টাকা পাওয়া যায়। জামদানি শিল্প বিলুপ্ত হতে থাকার এটিই অন্যতম প্রধান কারণ। মহাজনরা এই ব্যবসা করে ঠিকই লাভবান হচ্ছেন কিন্তু কারিগররা ন্যায্যমূল্যটা পাচ্ছে না।

একেএম মুজাম্মিল হক মাসুদ জানান, শিল্পটা ধরে রাখা আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই পেশায় উৎসাহিত করার জন্য সোনারগাঁয়ে বিপণন কেন্দ্র চালু করেছি আমরা। এছাড়া এখানে একটি কারুপল্লী রয়েছে যেখানে সোনারগাঁয়ের বিখ্যাত মসলিন কাপড়ের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে জামদানি শিল্পটা টিকে রয়েছে। আমরা এই শিল্পটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন