ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বায়ুদূষণে সিন্ডিকেট বাণিজ্য

বায়ুদূষণে সিন্ডিকেট বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির পাশাপাশি কয়লার দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির চুল্লি বেড়ে যাচ্ছে। এসব চুল্লিতে নির্বিচারভাবে কাঠ পোড়ানোর কারণে একদিকে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, আরেকদিকে উজার হচ্ছে বন। ঘন অরণ্য কিংবা বনপ্রধান এলাকায় এসব চুল্লি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের অদূরে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী-কয়রা প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশ দিয়ে কয়রার নাকশা পর্যন্ত অন্তত ৭০টিরও বেশি কাঠ থেকে কয়লা তৈরির অবৈধ চুল্লি।

স্থানীয়রা বলছেন, কয়লার চাহিদা পূরণ করতে চুল্লিতে কাঠের চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। চাহিদা ও লাভের বিষয়টিকে পুঁজি করেই চুল্লি স্থাপনে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মালিকরা। এসব চুল্লি থেকে কয়লা বস্তায় ভরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কল-কারখানায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাইকগাছায় গড়ে ওঠা ৭০টিরও বেশি চুল্লিতে প্রতিদিন পুড়ছে হাজার হাজার মণ কাঠ। আর চুল্লি এলাকা থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে বাতাসে অবিরাম নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় আকাশ-বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এসব এলাকার বাতাস ভরে আছে পোড়া কাঠের উটকো গন্ধে। নাকে-মুখে কাপড় গুঁজেও রেহায় মেলে না অনেক সময়। স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় বাসিন্দাদের। বায়ুবাহী রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। নির্গত এই ধোঁয়ার বিষ পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি রীতিমত স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদের লাখ লাখ মানুষের।

স্থানীয় সূত্রমতে, নদীর তীর, প্রধান সড়ক, স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এসব চুল্লিতে প্রতিদিন পুড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য ফলদ ও বনজ বৃক্ষ। চুল্লির কাঁচামাল হিসেবে কাঠের যোগান দিতে একদিকে যেমন বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ঠ, কাঁশিসহ বায়ু দূষিত নানা রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ বেড়েই যাচ্ছে।

চুল্লি সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যমতে, প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মণ পর্যন্ত কাঠের যোগান দিতে হয়। সে অনুযায়ী শতাধিক চুল্লিতে প্রতিবার ন্যুনতম ২০ থেকে ৩০ হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এভাবে প্রতিমাসে চুল্লিপ্রতি তিন থেকে চারবার কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করতে ৮০ হাজার থেকে এক লক্ষ মণ কাঠের যোগান দিতে হয়।

অথচ অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব চুল্লির কোনোটারই নেই বৈধ কোন কাগজ-পত্র। প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে পরিচালিত হয় এসব বায়ুদূষণ কারখানা। প্রভাব আর প্রতিপত্তির মুখে সরাসরি প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও খানিকটা সোচ্চার হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটাছুটির পর এসব অবৈধ চুল্লি ধ্বংসে অভিযান শুরু করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন।

সূত্রমতে, গত ৭ সেপ্টেম্বর এমন ৫টি অবৈধ কয়লা তৈরির কারখানা (চুল্লি) ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম। অভিযানকালে আদালত আগামী এক মাসের মধ্যে সব কারখানাসহ কয়লা তৈরির যাবতীয় সরঞ্জমাদি নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফুর রহমান, জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবু সাঈদ, পরিদর্শক মারুফ বিল্লাহ, পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগমের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত ছিলেন পেশকার ইব্রাহীম হোসেন ও আনসার সদস্যরা।

আদালত সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযান পরিচালনাকালে চুল্লিগুলো জলন্ত থাকায় বহুলাংশে ব্যাহত হয় এর কার্যক্রম। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তাৎক্ষণিক পার্শ্ববর্তী আশাশুনি থেকে ফায়ার সার্ভিসকে ডেকে নিয়ে আগুন নিভিয়ে পরিচালিত হয় উচ্ছেদ কার্যক্রম। এর আগে এসব চুল্লি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় গুরুত্ব সহকারে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে দেরিতে হলেও সর্বশেষ সেখানে অভিযান শুরু করে খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ উপজেলা প্রশাসন।

তবে অভিযানে স্থানীয়দের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা কাটেনি। পুরোপুরি সব চুল্লি উচ্ছেদের আগেই এর মালিকরা ফের স্বরুপে ফিরতে পারে বলেও আশংকা করছেন কেউ কেউ। এর আগে এলাকাবাসীর পক্ষে এসব অবৈধ চুল্লি বন্ধে খুলনা বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ হয়।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, উপজেলার চক্কাওয়ালীর মৃত মোহতেজ সরদারের ছেলে আব্দুল হালিম খোকনের মালিকানাধিন ৮টি, রেয়াজ উদ্দিন ছোট্টুর ছেলে হালিম রেজা মিন্টুর ৫টি, সেলিম রেজা লিটুর ৫টি, মৃত মনির উদ্দীন গাজীর ছেলে মশিউর রহমানের ২টি, মৃত মোনতেজ সরদারের ছেলে ইলিয়াস সরদারের ৩টি, শাহাদাৎ সরদারের ৫টি, মৃত মালেক সরদারের ছেলে আব্দুস সালাম সরদারের ২টি, হাফিজ সরদারের ৩টি, সাঈদ সরদারের ৪টি, গোলাম গাজীর ছেলে জয়নাল আবেদীনের ৩টি, মৃত আবু বক্কার গাজীর ছেলে শাহিদুর গাজীর ১টি, মৃত ছাত্তার সরদারের ছেলে সোবহান সরদারের ২টি, মৃত সরল ইুদ্দন গাজীর ছেলে আব্দুর রাজ্জাক গাজীর ৩টি, কানুয়ারডাঙ্গার সামাদ সরদারের ছেলে জিয়া সরদারের ২টি, কালিদাশ পুরের মৃত সুলতান সরদারের ছেলে নজরুল ইসলাম সরদারের ১০টি, মৃত নুর ইসলাম মাওলানার ছেলে ইনামুল হক গাজীর ৮টি ও বারিক সরদারের ছেলে ফেরদাউস সরদারের মালিকানাধিন ১টিসহ স্বনামে বে-নামে গড়ে উঠেছে প্রায় শতাধিক চুল্লি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব চুল্লি মালিকদের সমন্বয়ে আবার সংগঠনও রয়েছে। মূলত সংগঠনের ছায়াতলে এক প্রকার সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় অবৈধ এ বায়ুদূষণ ব্যবসা। চুল্লি মালিকদের একজন মশিউর রহমান কাজ করেন পরিবেশ ও মানবাধিকার আইন সহায়তা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট এওয়ারনেস এন্ড হিউম্যানিটি সোসাইটিতে। দায়িত্বে রয়েছেন জেলার পরিদর্শক ক্রাইম তদন্ত হিসেবে। তবে ‍তিনি চুল্লির মালিক হলেও জনপদে এমন পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকি কারখানা চান না। তার দাবি, লোক দেখানো দুই একটি অভিযান নয়, পুরোপুরি উচ্ছেদ হোক সবগুলো কয়লার চুল্লি।

মশিউর রহমান অভিযোগ করেন, পরিবেশ দূষণরোধে চুল্লির বিরোধিতা করায় প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হন তিনি। প্রভাবশারীদের পক্ষে রীতিমত চরম হুমকির মুখে রয়েছেন। তিনি বলছিলেন, চুল্লি মালিকদের নিয়ে তাদের সংগঠনই মূলত সার্বিক বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব চুল্লি পরিচালনায় বৈধ কোন অনুমোদন বা লাইসেন্স আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মালিক পক্ষের একাধিক ব্যক্তি জানান, তাদের কোনো লাইসেন্স লাগে না। তাদের কমিটিই বিভিন্ন জায়গায় সার্বিক সমস্যা বা সংকট মোকাবেলা করে থাকে।

বছরের পর বছর ধরে জনপদটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব চুল্লির বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কিংবা বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে কার্যত কোনো অভিযান পরিচালনা হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে জনৈক চুল্লি মালিক বলেন, বছরে দু’একবার খুলনা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযানে এলেও আগাম খবরে সাময়িক বন্ধ রাখা হয় কারখানাগুলো।

এ ব্যাপারে উপজেলা নিরাপদ খাদ্য ও স্যানেটারি কর্মকর্তা উদয় কুমার মন্ডল জানান, কাঠ পোড়ানোর ফলে কার্বন ও সীসা উৎপন্ন হয়ে, যা বাতাসে মিশে যায়। যে এলাকায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন করা হয়, ওই এলাকায় চুল্লির ধোঁয়ায় মানবশরীরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, অ্যালার্জি, চর্মরোগ, চোখের সমস্যাসহ নানা ধরনের রোগ দেখা দিতে পারে।

পাইকগাছা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির কোনো অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। যা অব্যাহত থাকবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক মো. আসিফুর রহমান জানান, অভিযান শুরু হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনুরোধে কিছুদিন সময় দেওয়া হয়েছে। আগামী দিন সকল অবৈধ চুল্লি উচ্ছেদ বাস্তবায়ন করা হবে।

আনন্দবাজার/শহক

সংবাদটি শেয়ার করুন