ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংকটে নয় চাপে অর্থনীতি

চাপে নেই সংকটে অর্থনীতি

পুঁজিবাদের বিকাশে সব দেশেই লুণ্ঠন হয়। বাংলাদেশে প্রথমে আর্থিক খাতে লুণ্ঠন হয়েছে। পরে হয়েছে পুঁজিবাজারে। এখন সরকারি প্রণোদনায় অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান লুণ্ঠন করছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে বলেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে নেই। তবে চাপে আছে।

গতকাল মঙ্গলবার ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ইআরএফ সংলাপ’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানির পুরানা পল্টনে ইআরএফ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি শারমীন রিনভী। সঞ্চালনায় ছিলেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম।

বাংলাদেশ সহসা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণ করতে পারবে কিনা সাংবাদিকদের এমন জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির প্রবণতার কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। ২০১৫-১৬ সালের কোনো তথ্য নেই। তারপরও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমরা জানতে পারি। বাংলাদেশের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্য বেড়েছে। এ বৈষম্য শুধু আয় বৈষম্য নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বৈষম্য খুবই প্রকট। এ বৈষম্য ভোগ পর্যন্ত গেছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ভোগ বৈষম্য আরও ব্যাপকভাবে আসবে। যা আগামী প্রজন্মের পুষ্টিহীনতায় আঘাত করতে পারে।

আমি আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে অর্থনীতির কোনো সুরাহা দেখছি না জানিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, যারা এখনও বলছেন আগামী ২ মাসের মধ্যে অর্থনীতি ঠিক হবে, চালের দাম ঠিক হবে। তারা কোনো উপকারী মন্তব্য করছেন না। তারা চট জলদি রাজনৈতিক চিন্তা থেকে মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। এটার ফলে বাজারে আরও বেশি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। এক্ষেত্রে সরকারি স্বচ্ছ পদক্ষেপই একমাত্র বাজারকে স্থিতিশীল করতে পারে।

তেলের পতন প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে তেলের দাম কিছুটা পতন হয়েছে তার কারণ হলো বাজার মন্দা। এ মন্দার কারণে কিছুকিছু জায়গায় পতন। সরবরাহের ক্ষেত্রে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধসহ অনেক ধরনের সমস্যা এটার ভেতরে আছে। আমাদের যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অবস্থা ফিরে আসেনি। আর্থিক সঞ্চালনের ক্ষেত্রে সে ধরনের সুরাহা ফিরে আসেনি এবং নিত্যপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পতন আমরা দেখছি না। গত দুই সপ্তাহে খাদ্য পণ্যের মূল্য উল্টো বেড়েছে। এটা হয়েছে টাকার মান কমার ফলে।

শুল্ক হার শতকরা হিসেবে কমালেও টাকার হিসাবে কমবে না উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারকে এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এখানে কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ দেখছি না। সরকার যেটুকু পদক্ষেপ নিচ্ছে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমদানি দিক থেকে সেগুলো ঠিক নিচ্ছে। তবে এগুলো পর্যাপ্তভাবে ও পূর্ণাঙ্গভাবে মধ্যমেয়াদে একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে চার ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে জানিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ না হওয়া, কর আহরণের দুর্বলতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বৈষম্য অর্থনীতির প্রধান বিচ্যুতি। এসব বিচ্যুতি ঠিক মোকাবেলা করা না গেলে পরবর্তী উত্তরণ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। একইসঙ্গে যে অর্জন হয়েছে সেটিও টেকসই হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জটিল এবং সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মন্তব্যে করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে এবং বিশ্বে এরকম পরিস্থিতি হতে পারে তা আগেই বলা হয়েছিলো। পাশাপাশি এ ধরনের সংকট মোকাবেলায় স্বল্প মেয়াদি স্থিতিকরণ কর্মসূচি জরুরি উল্লেখ করা হয়েছিলো। যে কারণে জিডিপির অভিলাষ সংযত করে মূল্যষ্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক ও বৈদেশিক লেনদেন নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিনিময় হার এবং মূল্যষ্ফীতিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা দ্রুত শেষ হবে না।

বাংলাদেশের মূল সমস্যা বৈদেশিক লেনদেনে নয় জানিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মূল সমস্যা আর্থিক খাতের দুর্বলতা। প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ না হওয়া। যে কারণে জ্বালানিতে ভর্তুকি, দরিদ্র্যদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আরও বলেন, প্রবৃদ্ধি মূলত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ দ্বারা ধাবিত। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। জিডিপির প্রায় ২৪ শতাংশে আটকে আছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ৫/৬ শতাংশ থেকে ৭/৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও হয়নি। এফডিআই জিডিপির এক শতাংশের নিচে। যা গতিশীল অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট না। আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেশি হলে সেগুলোর সুবিধা নিয়ে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা ঘটেনি। বাংলাদেশের অবস্থা এক ইঞ্জিনে চলা অ্যারোপ্লেনের মত। যে বেশি দূর যেতে পারে না। কিছু দূর চলার পর রানওয়ে খুজতে থাকে।

এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে। এর অর্থ আয় বাড়ছে। তাহলে কর সংগ্রহ হচ্ছে না কেন? তাহলে কি সংগ্রহ করা হচ্ছে না ? নাকি হিসাবের গড়মিল আছে। কর সংগ্রহ করতে না পারার কারণে এখন আমদানি করা যাচ্ছে না। খাদ্য সহায়তা বাড়ানো যাচ্ছে না। শুল্ক কমাতে পারছে না। পরোক্ষ কর থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে হচ্ছে বেশি। যা সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার ভৌত অবকাঠামো যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সেই বরাদ্দ থাকছে না। ২০টি মেগা প্রকল্পের জন্য জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকছে জিডিপির এক শতাংশ। শিক্ষাতে সমপরিমাণ। রাজনৈতিক শক্তি বৈধতার জন্য খুব দ্রুততার সাথে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন করতে চাচ্ছে। রাজনৈতিক ঘাটতি পুরনের চেষ্টা হচ্ছে। কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগের ফলাফল আসতে দশকের বেশি সময় লাগে। রাজনৈতিক চক্রে এই সময় নেই। পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বৈষম্য হচ্ছে। করোনার সময় সহায়তা বিতরণে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা দিয়েছে। যার যা প্রাপ্য তা নথিভুক্ত হয়নি। ফলে প্রমাণিত হয়েছে সরকারের সেবা পাওয়ায় দুর্বল নাগরিকদের অভিগমন সহজ নয়।

দেশে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না জানিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশেষ জায়গা থেকে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে মেধাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যক্তি বিনিয়োগ বিকশিত হচ্ছে না। এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে সরকার, মানুষ ও দেশের। বিদ্যুৎ জ্বালানিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ তুলে নেওয়া হয়েছে। বিচারের সুযোগও তুলে নেওয়া হয়েছে।

সবর্ত্র লুণ্ঠন প্রসঙ্গ টেনে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পুঁজিবাদের বিকাশে সব দেশেই লুণ্ঠন হয়। বাংলাদেশে প্রথমে আর্থিক খাতে লুণ্ঠন হয়েছে। পরে হয়েছে পুঁজিবাজারে। এখন সরকারি প্রণোদনায় অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান লুণ্ঠন করছে। তবে লুণ্ঠনের পরে বিচার ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে তা দেখা যাচ্ছে না। এখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে সংযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে জবাবদিহিতার জায়গা দূর্বল হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে প্রধান রাজনৈতিক শক্তির।

বাংলাদেশের অর্জন আছে কিন্তু বিচ্যুতিও আছে উক্তি করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই বিচ্যুতি অর্জনকে দুর্বল করে দিতে পারে। টেকসইতা কমিয়ে দিতে পারে। তবে বাংলাদেশ অনেক সমস্যা উত্তরণ করে এই অবস্থায় এসেছে। আশা করা যায় আগামীতে সমস্যা উত্তরণ করে এগিয়ে যাবে।

অর্থনীতি সংকট প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে নেই, তবে চাপে আছে। তবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখন যে অস্থিরতা চলছে, তা সহসাই কাটবে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকবে। যারা বলছেন শিগগিরই সংকট কেটে যাবে, তারা চটজলদি রাজনৈতিক চিন্তা থেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। এতে বাজারে অস্থিতিশীলতা ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিনিময় হার বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার সঙ্গে অর্থ পাচারের সংযোগ থাকতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম ৪৬ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে ৫ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত অনৈতিক অব্যবস্থাপনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

গত এক দশক দেশের ইতিহাসে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিশীল দশক। বলতে হবে সফল দশক। এ সময়ে দেশ নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ে উন্নীত হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে এসেছে। সফলভাবে এমডিজি অর্জন করেছে। এসডিজি বাস্তবায়নে এগিয়েছে। মানুষের আয়ুষ্কাল, কৃষি উৎপাদন, শিক্ষার হার, মাথাপিছু রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। বলতে হবে গত ১৩ বছর ছিলো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ সময়। তবে এ এতকিছুর পরও পেশাদার অর্থনীতিবিদদের দুঃখের কিছু বিষয় রয়েছে।

অনুষ্ঠানে ইআরএফের সভাপতি শারমীন রিনভী বলেন, বর্তমানে সব কিছুর দাম বাড়তি। যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। ফলে প্রয়োজন মিটাতে হিমশিম খাচ্ছে। জনসাধারনের কষ্ট লাঘবে সরকারকে সব কিছুর দাম নিয়ন্ত্রনে আনার আহবান জানান। একই সঙ্গে সব ধরনের অনিয়ম রোধে কঠোর হবারও পরামর্শ দেন।

আনন্দবাজার/শহক

সংবাদটি শেয়ার করুন