২০২৫ সালের বিশ্ব রাজনীতি যেন এক দাবার বোর্ড, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিটি চাল পাল্টা চাল দিয়ে রুখে দিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং। বছরের শুরু থেকেই ট্রাম্পের একের পর এক নির্বাহী আদেশ, আমলাতন্ত্রে ইলন মাস্কের অভাবনীয় হস্তক্ষেপ আর কঠোর শুল্কনীতির ঘোষণা বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করলেও, বছর শেষে দেখা যাচ্ছে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন শি-ই। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি যখন মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তখন বেইজিং তার শিল্প সক্ষমতা ও সাপ্লাই চেইনের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে বিশ্বকে নিজের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে।
চীনের এই দাপটের মূল ভিত্তি হলো তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদন ক্ষমতা। বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশই চীনের দখলে। বিশেষ করে সবুজ প্রযুক্তি যেমন—সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ উপকরণ সরবরাহ করে বেইজিং। এর বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-তে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বিধিনিষেধের মুখেই ‘ডিপসিক’ (DeepSeek)-এর মতো প্রযুক্তি এনে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিয়েছে তারা। ওষুধশিল্পেও চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমান গতিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে। এক সময় সস্তা শ্রমের জন্য পশ্চিমা দেশগুলো চীনে যেত, আর এখন তারা সেখানে যাচ্ছে উন্নত গবেষণাগার তৈরি করতে।
এই অর্থনৈতিক প্রভাবকে শি চিন পিং এখন রাজনৈতিক ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তিনি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, চীনকে চটালে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন মুহূর্তেই অচল হয়ে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণা বলছে, ৭৪টি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ৬৬টিতেই চীন এগিয়ে। এর মধ্যে দুই ডজনের বেশি খাতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রাম্পের অনেক হঠকারী সিদ্ধান্ত পরোক্ষভাবে চীনের পালে হাওয়া দিয়েছে। চীনকে শুল্ক দিয়ে কোণঠাসা করতে গিয়ে ট্রাম্প উল্টো নিজের মিত্র দেশগুলোকেই চটিয়েছেন। অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক ব্যবস্থার অভাব থাকায় চীন যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্রুত সামলে নিতে পারে। ট্রাম্প যখন ‘ওক’ (woke) মতাদর্শের দোহাই দিয়ে গবেষণায় অর্থায়ন কমাচ্ছেন বা বিদেশি বিজ্ঞানীদের প্রতি বৈরী আচরণ করছেন, তখন সেই সব মেধাবী মুখগুলো চীনের দিকে ঝুঁকছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে চীনের এই জয়যাত্রা কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? কিছু সংকটের মেঘ বেইজিংয়ের আকাশেও জমছে। গত তিন বছর ধরে দেশটিতে পণ্যের দাম কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ইঙ্গিত। আবাসন খাতে ধস নেমেছে এবং স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের ভারে জর্জরিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সাল নাগাদ চীনও জাপানের মতো দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতায় পড়তে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, শি চিন পিংয়ের একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় তাঁর ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই, যা দীর্ঘমেয়াদে চীনের জন্য কাল হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকার প্রকৃত সংকট এর অর্থনীতিতে নয়, বরং এর আদর্শিক অবস্থানে। যে দেশ একসময় বিশ্বের মেধা ও বৈচিত্র্যকে আপন করে নিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল, ট্রাম্পের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদ সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০২৬ সালে স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপন করতে যাওয়া আমেরিকা যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত, বেইজিং তখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্বব্যবস্থার নতুন বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করছে। ট্রাম্পের হুঙ্কার না কি শি’র নীরব আধিপত্য শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে, তা নির্ধারণ করবে আগামীর সময়।




