শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

প্রতিবাদের শুরুটা হোক পরিবার থেকেই

জান্নাতুন নাইয়ুম সোমা

ভোর ছয়টার এলার্মে ঘুম ভাঙ্গে আদিবের। ভোরের আকাশ আর বাতাসের গন্ধ গায়ে না মাখলে তার সকালটাই নাকি পানসে হয়ে যায়। তাইতো নামাজ সেরেই ছাদে যাওয়া তার রোজকার অভ্যাস।এই লকডাউন পরিস্থিতিতেও তার অভ্যাসটা পাল্টায় নি।

তাছাড়া আজকের দিনটা আদিবের কাছে বিশেষ একটি দিন। সে আজ ষোলোতে পা রাখল। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে।বাবা উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকায় তাদের বেশ প্রতিপত্তি। যদিও এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আদিবের। সে পেয়েছে মায়ের স্বভাব। সাদামাটা এবং সরল।

আদিব ছাদের রেলিং ধরে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। হঠাৎ গাড়ির হর্নে চমকে উঠলো সে।খেয়াল করলো বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট ট্রলি থেমেছে। আর গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ম্যানেজার কাজের লোকটিকে উচ্চস্বরে হুকুম দিচ্ছে

-“গাড়ি ভর্তি চালের বস্তা আর তেলের প্যাকেট। সাবধানে স্টোররুমে নিয়ে যাবি।”

আদিব বুঝতে পারল করোনার জন্য অনুদান এসেছে। কিন্তু অনুদানের সামগ্রী তাদের স্টোররুমে কেন থাকবে!
প্রশ্নটা মনে হতেই আদিবের মন খারাপ হয়ে গেল।সে মনে হয় কেন-র উত্তরটা খুঁজে পেয়েছে। আদিব আর ছোট্টটি নেই। সে অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছে আর বুঝতে শিখেছে বলেই হয়তো তার চোখে দৃশ্যমান বাবার দুর্নীতিগুলো তার হৃদপিন্ডে তীরের মত বাঁধে।

আদিব মুহূর্তেই বুঝতে পারল তার এই জন্মদিনটা হবে মন খারাপের জন্মদিন। সে ধীর পায়ে রুমে ফিরে দরজা আটকে দিল।

-কিরে আদিব! নাস্তা করবি না? তোর জন্য পায়েস করেছি যে..!
দরজার ওপাশে মায়ের গলা

আরও পড়ুনঃ  এসএসসি ও সমমানে পাসের হার ৮০.৩৯

-পেটটা যেন কেমন করছে মা… খাব না।
-কিরে, শরীর খারাপ?
-উহু… কিছু হয়নি ।তুমি যাওতো!

দুপুরেও আদিব কিছু খেলো না। মা অনেক করে বলার পরেও না। তার মনে যে উত্তাল ঝড় বইছে আদিব জানে এই ঝড় শান্ত হতে সময় লাগবে।

#
রফিক সাহেব সাধারণত রাত বারোটার আগে বাড়ি ফেরেন না।কিন্তু আজ ফিরলেন নয়টায়। ছেলের জন্মদিন বলে কথা! রাতে একসাথে খাবেন।

-আদিব,বাবা খেতে আয়।
বাবার আদুরে গলা আদিবের কানেআসলো।

আদিব কোন উত্তর না দিয়েই চুপচাপ খাবার টেবিলে বসে পড়ল।কিন্তু যে বিমর্ষতা তার চোখে-মুখে লেগে আছে তা
আড়াল করা সত্যিই কষ্টের।

-কি হয়েছে, খোকা? শুনলাম, সকাল থেকে কিছুই খাস নি! গিফট পাসনি দেখে মন খারাপ? হা..হা..হা.. খেয়ে নে..তোর জন্য সারপ্রাইজ গিফট আছে!

আদিব এখনো চুপ। মাপ্লেটে খাবার সাজিয়ে দিল..
-নে বাবা.. খেয়ে নে তো!

আদিব মাথা নিচু করেই প্লেটটা হাত দিয়ে সরিয়ে রেখে বলল-
– অন্যের খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না, মা।

আদিব বুঝতে পারল দুজোড়া চোখ তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে অবিশ্বাসের অনুভূতি নিয়ে।

-আমার সারপ্রাইজ গিফট লাগবে না বাবা। গরিবের অধিকার কেড়ে নিয়ে যে দামি গিফট আর খাবার আমাদের বাসায় আসে সেসব আমি ছুঁয়েও দেখতে চাইনা।

কথা শেষ করেই আদিব ধীর পায়ে তার রুমে ফিরে এলো।

রফিক সাহেব বাকরুদ্ধ হয়ে টেবিলেই বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কি করবেন তিনি? ছেলেকে বকবেন? শাসন করবেন? নাকি সেই অধিকার তিনি হারিয়ে ফেলেছেন?
বিবেকের কাঠগড়ায় তিনিই যে আজ বন্দি। একমাত্র ছেলের কয়েকটি কথাই যেন তার বুকটাকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত জবি শিক্ষার্থীদের

#
পরদিন সকাল বেলা। আদিব যথারীতি ছাদে গেল কিন্তু রেলিংএর পাশে দাঁড়াতেই সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাদের বাড়ির সামনে
ত্রাণের সামগ্রী বিতরনের আয়োজন চলছে!

আদিব একছুটে বাবার রুমে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবা তার ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।মনের অজান্তেই তার চোখ সিক্ত হয়ে উঠলো।

আদিব আনন্দে চিৎকার করে উঠল

-আমি আমার সারপ্রাইজ গিফট পেয়ে গেছি বাবা। আর কিছুই চাইনা.. কিচ্ছুটি না….

জান্নাতুন নাইয়ুম সোমা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

উল্লেখ্য এই গল্পটি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ইয়েস গ্রুপ আয়োজিত করোনাকালে দুর্নীতি ও প্রতিরোধের গল্প শিরোনামে ‘দুর্নীতিবিরোধী গল্প লেখা’ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন