মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১লা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ঢাবির ৫৩তম সমাবর্তন---

স্বপ্ন মেলেনি ডানা

স্বপ্ন মেলেনি ডানা

ঐতিহ্য যেন সংকুচিত হয়ে আসছে: রাষ্ট্রপতি

স্বপ্ন ডানা মেলেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে। এরই মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫৩তম সমাবর্তন। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এবারের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে বৃহৎ হলেও আছে অন্যপিঠের গল্পও। করোনা মহামারির প্রভাব, বেকারত্বের তকমা, পারিবারিক-অর্থনৈতিক চাপ এবং সর্বপরি সমাবর্তনে অংশগ্রহণ ফির টাকা জমা দিতে না পেরে অনেকে অংশগ্রহণ করতে পারেনি শিক্ষাজীবনের শেষ এই স্বপ্নের অনুষ্ঠানে।

বলা হয়ে থাকে উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে সমাবর্তন গ্রহণের মাধ্যমে। শিক্ষার্থীরা কালো গাউন এবং টুপি আকাশে উড়িয়ে স্বপ্নগুলোকে আকাশের খুব কাছে নিয়ে যায়। ঠিক গত কয়েকদিন ধরে এমনটিই দেখা গিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাাসে। কেউবা বন্ধু-বান্ধবসহ, কেউবা বাবা-মহ আবার কেউবা নিজের স্ত্রী-সন্তানসহ আনন্দ আর উৎফুল্লের সহিত উদযাপন করেছে নিজের সমাবর্তনকে। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঐতিহাসিক জায়গায় নানা ঢঙে ছবি তুলে স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি।

তবে আছে অন্য পিঠের গল্পও! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। তিনি ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী। কলাভবনের একটি বিভাগ থেকে শেষ করেছেন পড়াশোনা। পরিবারের বড় সন্তান তিনি। আছে দুজন ছোট ভাই-বোন। তারাও পড়াশোনার করছেন মাধ্যমিক পর্যায়ে। নিজের পড়াশোনা শেষ করে এখন যেমন চাকরির চিন্তায় ঠিকমত ঘুমাতে পারেন না; ঠিক সে সময়ে পাঠাতে হয় ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ এবং মা-বাবার ওষুধের টাকা। দেশের অর্থনৈতিক সংকটকালীন বেড়ে গেছে শহিদুলের নিজের জীবনযাত্রা নির্বাহের খরচও। ‘আগে ৩  থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মধ্যে একটা মাস অতিক্রম করতে পারতাম। এখন এখন ৬ হাজার টাকার মতো লাগে’ বলছিলেন শহিদুল।

আরও পড়ুনঃ  ডলারের চাপ খাদ্যপণ্যে

কেন সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করেন নি? এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাকে জানায়, অনেক ইচ্ছে ছিল বাবা-মাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে এসে তাদের নিয়ে সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করবো। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। সেটা আর করা হলো না। একদিকে বেকারত্বের তকমা ঘোচার চেষ্টা এবং অন্যদিকে নিজের পরিবারকে অর্থনৈতিক সাপোর্ট দেওয়া ইতোমধ্যে আমার কাছে জীবন-মরণ লড়াই হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেখানে আলাদাভাবে ৩ হাজার টাকা দিয়ে সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করাটা আমার পক্ষে একরকম বিলাসিতা। তাই এ কারণে এবার সমার্তনে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।

জানা যায় এবারের সমাবর্তনে অনার্স পাশ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ফি ছিল ৩ হাজার ৩২০ টাকা। তবে হল ভেদে এ ফির পার্থক্যও ছিল। অন্যদিকে মাস্টার্স পাস শিক্ষার্থীদের এ ফি ছিল ৪ হাজারের অধিক। সমাবর্তনে অংশগ্রহণের এ ফি কমানো উচিত কি না এ বিষয়ে শহিদুল জানায়, হ্যাঁ অবশ্যই কমানো উচিত। কেননা আমরা অনেকেই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমার মতো আরও অনেকেই ঠিক এ টাকার কারণে অংশ নিতে পারে নি। তাই এ দিক বিবেচনায় ফি কমানো উচিত। সহনীয় পর্যায়ের একটা ফি নির্ধারণ করা উচিত।

ফি কমানো নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকায় তা সম্ভব হয় নি। গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ৫৩তম সমাবর্তন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সমাবর্তনে মোট ৩০ হাজার ৩৪৮ জন গ্রাজুয়েট ও গবেষক অংশগ্রহণ করেছেন।

আরও পড়ুনঃ  রেমিট্যান্সের পালে হাওয়া

অনুষ্ঠানে ১৩১ জন কৃতী শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীকে ১৫৩টি স্বর্ণপদক, ৯৭ জনকে পিএইচডি, ২ জনকে ডিবিএ এবং ৩৫ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি ও ঢাবি চ্যান্সেলর মোঃ আবদুল হামিদ এবং সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোবেল বিজয়ী ফরাসী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. জঁ তিরোল।

সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে শিক্ষা প্রসার ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে জ্ঞানী-গুণী, শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি, বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক ও মানবিকগুণসম্পন্ন অসংখ্য সৃষ্টিশীল মানুষ। দেশের ভৌত ও গুণগত উন্নয়নে যাঁদের অবদান চিরভাস্বর হয়ে আছে।

আচার্য আবদুল হামিদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র উচ্চ শিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি আমাদের নেতৃত্বের প্রতীক, আমাদের পথ প্রদর্শক। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। প্রতিটি আন্দোলনের নিউক্লিয়াস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া যুগ যুগ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা আলোকিত মানুষ হয়ে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও কার্যকর অবদান রাখবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশ্য করে বলে আবদুল হামিদ বলেন, ইদানিং পত্রিকা খুললেই মনে হয় পরিবার-পরিজন ও অনুগতদের চাকরি দেওয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেয়াই যেন কিছু উপাচার্যের মূল দায়িত্ব। আবার অনেক শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাকে ঐচ্ছিক দায়িত্ব মনে করেন। বৈকালিক কোর্স বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়াকেই তারা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছাত্র-শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে এটি খুবই বেমানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই কৃতি ও সেরা ছাত্র ছিলেন। আমার বিশ্বাস আপনারা যে কোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হতেন। কিন্তু জীবনের মহান ব্রত হিসাবে শিক্ষকতাকেই আপনার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাই শিক্ষক হিসাবে নিজ পেশার প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুনঃ  স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা পাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

আচার্য আরও বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো এক একটি গবেষণাগার। আর মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে মানসম্পন্ন গবেষণা ও গবেষণালব্ধ কাজের প্রয়োগ অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার মাধ্যমেই সাফল্য লাভ করেছে। যুগের সাথে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবনযাত্রা গতিশীল হলেও দুঃখের বিষয় হলো গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি।

আবদুল হামিদ বলেন, এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হতো। সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই যেন সেই ঐতিহ্য সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ ছাত্র-শিক্ষক, ভৌত অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত না হলেও কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষার গুণগত মান এবং গবেষণার ক্ষেত্র, পরিমাণ ও মান কতটুকু বেড়েছে বা কমেছে সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। এসময় গবেষণার বিষয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয় তা দেখলে বা শুনলে অনেক সময় লজ্জায় পড়তে হয় বলে মন্তব্য করেন আচার্য। এজন্য তিনি তরুণ গবেষকদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন