শুক্রবার, ২৬শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

খাদ্যে ভরসা থাইল্যান্ড

খাদ্যে-ভরসা-থাইল্যান্ড

বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিয়ে বার বারই সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এমনকি বৈশ্বিক মহামন্দার কারণে দুর্ভিক্ষেরও আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান জনগণকে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে দফায় দফায় তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি চাষের আওতায় আনার নির্দেশ দিচ্ছেন। আমদানির চেয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলার কথা ভাবা হচ্ছে। এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তায় আশার আলো দেখাচ্ছে থাইল্যান্ড। ইন্টারন্যাশনাল পলিসি ডাইজেস্টের গত ২৮ নভেম্বরের এক প্রতিবেদন এমন বার্তাই দিয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচক অনুযায়ী, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘গ্রিন জোনে’ রয়েছে বাংলাদেশ। এরপরও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহের দিকে মনোযোগ বাড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি। এমনকি অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও সফর করেছেন।

মূলত, বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে গোটা বিশ্ব। এ সংকট কে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে দেখছেন অনেকেই। এদিকে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহের একটা বড় অংশ নির্ভর করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর। আর তাই দেশ দু’টির সংঘাত প্রভাব ফেলেছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপরেই।

এমন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এতকিছুর পরও সংকট নিরসনের পাশাপাশি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভরসা হতে পারে থাইল্যান্ড। এমনকি একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও হতে পারে দেশ দু’টি।

অন্যদিকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক দেশ থাইল্যান্ড চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড চাল রপ্তানি করেছে। আশা করা হচ্ছে, বাংলাদেশকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আগামী দিনগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে সহায়তা করবে থাইল্যান্ড।

আরও পড়ুনঃ  উত্তরে ভারী শিল্পের হাতছানি

গত ২০ বছরে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৩২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৯০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের এই বৃদ্ধি বেশ লক্ষণীয়। এছাড়া থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ উভয়ই ধীরে ধীরে করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে উঠছে এবং এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আগের বছরের তুলনায় ২০২১ সালে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

থাইল্যান্ড বাংলাদেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করেছে তার মধ্যে রয়েছে- চাল, লবণ, সালফার, প্লাস্টিক, খনিজ জ্বালানি, খনিজ তেল, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম। এসব পণ্য বাংলাদেশের উৎপাদন ও শিল্পায়ন উভয় খাতের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংক চলতি বছর থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে এবং ২০২৩ সালে এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশের সাথে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে আগ্রহী থাইল্যান্ড। যেহেতু উভয় দেশ পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে উপকৃত হতে পারে, তাই বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ করে তা ২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

গত ২০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমন ভাবে থাইল্যান্ডে মেডিকেল ট্যুরিজম খাতে বেশ বড় অবদানকারী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন বাংলাদেশি নাগরিক থাইল্যান্ডে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার লক্ষ্যে ভ্রমণ করেছেন এবং দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ১৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবদান রেখেছেন।

আর তাই মেডিকেল ট্যুরিজম খাতের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে বাংলাদেশিদের এই অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া লাখ লাখ থাই পর্যটকও বাংলাদেশেও ভ্রমণ করেছেন এবং এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে যে খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং এই পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ড বাংলাদেশকে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশও যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর তীব্র সংকটে ভুগছে। অন্যদিকে থাই স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের দেশে উচ্চ চাহিদা রয়েছে এবং আর তাই বাংলাদেশকে এই কর্মীদের সরবরাহ করতে পারে থাইল্যান্ড।

বিশাল সম্ভাবনার সাথে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দেশটি তার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানোর জন্য প্রচুর পরিকাঠামোগত প্রকল্পের উন্নয়নও করছে। এর পাশাপাশি কৌশলগতভাবে বাংলাদেশ ভারত মহাসাগরের ধারে অবস্থিত, যা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ।

আর তাই দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশ। বিপরীতভাবে, থাইল্যান্ড বাংলাদেশের জন্য একটি সরবরাহ কেন্দ্র হওয়ার জন্য ভালো ভৌগলিক অবস্থানে রয়েছে। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির সঙ্গে স্থল এবং সমুদ্র উভয় মাধ্যমে এশিয়ার অন্যান্য দেশের সংযোগও রয়েছে।

অর্থনৈতিক সুবিধা ছাড়াও বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বিস্তৃত একটি সম্পর্ক ভ্যাকসিন উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, সমুদ্র অর্থনীতি, উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প, অটোমোবাইল উৎপাদন এবং জাহাজ নির্মাণে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে।

আর বর্তমানে নিজেদের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে উভয় দেশ। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য সুস্পষ্ট একটি দৃষ্টিভঙ্গিসহ শক্তিশালী অংশীদারিত্বকে জোরালো করতে একসঙ্গে কাজ করা উচিত।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন