শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

প্যারেট পোকা চাষে সাফল্য

প্যারেট পোকা চাষে সাফল্য

প্রথমবারের মতো শেরপুরে চাষ হচ্ছে বিশ্বমানের ও স্বল্পমূল্যে পুষ্টিকর প্রাকৃতিক পোল্ট্রি খাদ্য ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই বা প্যারেট পোকা। এই পোকা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার স্বপ্ন দেখছেন শফিকুর রহমান শফিক নামে এক উদ্যোক্তা। শফিকের বাড়ি শেরপুর নকলা উপজেলার নারায়নখোলার চরবসন্তী গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের সোরাতুজ্জামানের ছেলে।

উদ্যোক্তা শফিক বলেন, ইউটিউবে ভিডিও দেখে তিনি হাঁস, মুরগি ও মাছের প্রাকৃতিক খাবার প্যারেট পোকা চাষ করবেন বলে ভাবতে থাকেন। সেই ভাবনাকে বাস্তবে রুপ দিতে ওই পোকার বীজ সংগ্রহ করতে তিনি ছুটে যান গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জে। ওই এলাকার ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকারের কাছ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকায় প্যারেট পোকার এক কেজি বীজ বা লার্ভা কিনে আনেন। পরে ওইসব পোকার সংখ্যা বাড়াতে শুরু করেন পরিচর্যার কাজ। ৬/৭ মাসেই খামারে ২ হাজার ৭শ কেজি লার্ভা উৎপাদন হয়। পারিবারিক সমস্যার কারণে খামারে সময় কম দেওয়ায় উৎপাদন কিছুট কমেছে। এখন আবার সময় দেয়া শুরু করেছি। আশা করছি উৎপাদন আগের মতো হবে। দৈনন্দিন খাবারের ফেলে দেয়া অংশ যেমন পাকা কলা, পঁচা আলু, মাছ ও মুরগির নাড়িভুড়ি, গম ও ভূট্টার গুড়াসহ বিভিন্ন ধরণের পচনশীল দ্রব্য দেয়া হয় পোকাগুলোকে। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই খামারে শুরু হয় উৎপাদন। প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে লার্ভা ও পোকার সংখ্যা। আর সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া যায় গরমকালে। একটি পূর্ণ বয়স্ক প্যারেট পোকা পাঁচ হাজার ডিম দেয়। মাত্র দশ গ্রাম ডিম থেকে অন্তত ৩০ কেজি লার্ভা পাওয়া যায়।  সেইসব লার্ভা হাঁস, মুরগি ও মাছের জন্য খুবই উন্নত মানের খাবার। বর্তমানে তার খামারে প্যারেট পোকার লার্ভা ও মাতৃপোকা তৈরি হচ্ছে। আর এর উৎপাদন ব্যয় নেই বললেই চলে। প্যারোট পোকা উৎপাদন করতে দরকার হয় মশারি নেট, কয়েকটি হাড়ি  ও কয়েকটি কাঠের টুকরো। এই পোকা পরিবেশবান্ধব এবং কৃষকের বন্ধু। শুষ্ক অবস্থায় এই পোকার লার্ভা থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আমিষ, ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ স্নেহ এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ শর্করা পাওয়া যায়। এই পোকার লার্ভাতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সোডিয়াম। এছাড়াও ময়লা-আবর্জনা, পচনশীল ফলমূল, শাক সবজি, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা এবং গৃহপালিত প্রাণীর মল খায় পোকাটির লার্ভা। এই পোকা জৈব আবর্জনার ৭১.৫ শতাংশ পর্যন্ত খেয়ে হজম করে থাকে। অবশিষ্ট অংশ বায়োডিজেল, প্রোটিন এবং কম্পোস্ট সারে রূপান্তরিত হয়। দেশ ও বিদেশে প্যারেটের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে শফিক বলেন, চাকরি না খুঁজে বাণিজ্যিকভাবে প্যারেট পোকা চাষ করে হাজারো যুবক-যুবতী তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারেন। প্রাণী সম্পদের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে তিনি বড় পরিসরে প্যারেট পোকা চাষাবাদ করতে চান। পাশাপাশি মানুষের মাঝে উপকারী এই পোকা চাষাবাদ পদ্ধতি পৌঁছে দেয়ার ইচ্ছেও আছে তার। অল্প খরচে স্বল্প জায়গায় এই পোকার চাষ করে তিনি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছন।

আরও পড়ুনঃ  বাধা হতে পারেনি দৃষ্টিহীনতা

উদ্যোক্তা শফিকের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, আমার দেশী মুরগির খামার আছে। এই পোকা বা লার্ভা খাইয়ে আমরা বেশ লাভবান। লার্ভা খেয়ে মুরগী সহজেই বড় স্বাস্থ্যবান হচ্ছে এবং ডিমও দিচ্ছে বেশি। আমরা এখনো এই পোকা বিক্রি শুরু করিনি। আপাতত আমদের খামারের মুরগিদের খাওয়াচ্ছি। এখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।

স্থানীয় পোল্ট্রি খামারি তোফাজ্জল মিয়া, আতাহার আলী ও শিহাবউদ্দীন বলেন, সকল সমস্যার সমাধান হতে পারে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই বা প্যারেট পোকা । এই পোকা খুবই উচ্চ প্রোটিন যুক্ত ও অন্যান্য ভিটামিন এবং মিনারেল সমৃদ্ধ। আর শতভাগ প্রাকৃতিক। প্যারেট পোকা রোগ বহন করে না। স্যালমোনেলা ও টক্সিনের মতো ভয়ংকর রোগকে ধ্বংস করে। এই প্যারেট পোকা উৎপাদন বা পালিত হয় পচনশীল যেকোনো পরিত্যক্ত বস্তু ও বর্জ্য থেকে, যা পরিবেশ ভালো রাখে । এ থেকে জৈব সার উৎপাদন করে কৃষি জমিতে ব্যবহার করা যায়। তারা আরো বলেন, বর্তমানে মৎস্য, পোল্ট্রি ও হাঁস পালনের প্রধান অন্তরায় খাদ্য ব্যয় ও রোগবালাই। খামারের ৮০ ভাগ ব্যয় হচ্ছে খাদ্যের পেছনে। তারপরও  মান সম্পন্ন খাদ্যের ব্যাপক সংকট রয়েছে। এছাড়া পোল্ট্রি খাদ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে বিষাক্ত পরিত্যক্ত ট্যানারির বর্জ্য। যা মানবদেহ ও পশু-পাখির জন্যও ক্ষতিকর। এইসব ক্ষতিকর উপাদানে তৈরিকৃত খাদ্য কিনতে হচ্ছে লাগামছাড়া দামে। মূলত এজন্যই খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন । গুণগত মানের খাদ্যের অভাব, উচ্চমূল্য এবং বিভিন্ন স্পর্শকাতর রোগ বহন করায় ওষুধের পেছনেও বিশাল অংকের ব্যয় হচ্ছে। শুধু তাই না ভ্যাকসিন করেও ঠেকানো সম্ভব হচ্ছেনা রোগবালাই। তারা মনে করেন জেলায় শফিকের মতো আরো উদ্যোক্তা প্যারেট চাষে এগিয়ে এলে পোল্ট্রি শিল্প নতুন করে প্রাণ শক্তি ফিরে পাবে।

আরও পড়ুনঃ  শীতলক্ষ্যা চরে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ

প্যারেট পোকা চাষে আগ্রহী নকলা উপজেলার নাহিদুর রহমান বলেন, বাস্তবে প্রথম প্যারেট পোকা দেখলাম। ইউটিউবে আগে দেখেছি। ইচ্ছে ছিল এই পোকা চাষ করার, দুর থেকে নিয়ে আসতে হয় বলে তা করা হয়নি। এখন বাড়ির কাছে পেয়েছি তাই চাষ করবো।

শেরপুর জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নকলার খামারি শফিকুর রহমান শফিক অল্প দিনেই প্যারেট পোকা চাষে সফলতা পেয়েছেন। তাদের এই কাজে সকল ধরনের সহায়তা করা হবে।  বাজারে প্রচলিত খাদ্যের চেয়ে এই খাদ্য অনেক বেশি মানসম্পন্ন হওয়ায় মাছ ও মুরগীর জন্য অনেক উপকারী। অল্প খরচে স্বল্প জায়গায় এই  পোকা চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কেউ প্যারেট পোকা চাষ করতে চাইলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে ।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন