ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পানির খোঁজে বোরিং, শেষে মৃত্যুকূপ

বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এখন আর সহজে পানি মিলছে না। ফলে নলকূপ স্থাপনের সময় একের পর এক জায়গায় বোরিং করে পরীক্ষা চালাতে হচ্ছে। এক জায়গা থেকে সেমিডিপ তুলে অন্য জায়গায় বসানোর প্রক্রিয়াকে ‘রিবোরিং’ বলা হয়।  নতুন জায়গায় পানির স্তর না মিললে একাধিক স্থানে বোরিং করতে হয়। এতে আগের স্থানের গর্ত অনেক সময় খোলা থেকে যায়। ধীরে ধীরে এসব পরিত্যক্ত গর্তই পরিণত হচ্ছে নীরব মৃত্যুফাঁদে।

সম্প্রতি রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাকিব উদ্দীনের সন্তান সাজিদ নিহত হয়। প্রায় ৩২ ঘণ্টা ধরে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা শিশুটিকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। সাজিদের এই অকাল মৃত্যু বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও নাচোল এবং নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহারে ছড়িয়ে রয়েছে এমন শত শত পরিত্যক্ত নলকূপের গর্ত। সাধারণত ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের এসব গর্ত কোথাও আংশিক ভরাট করা হলেও অধিকাংশই রয়ে গেছে খোলা অবস্থায়। এসব গর্তে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, যদিও সব ঘটনা সামনে আসে না। তবে গেল বুধবার (১০ ডিসেম্বর) একটি গর্তে পড়ে দুই বছরের শিশু সাজিদের মৃত্যুর ঘটনা আবারও এই ভয়ংকর ঝুঁকিকে সামনে এনে দিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব অঞ্চলে মোট কতটি পরিত্যক্ত গর্ত রয়েছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছেও নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কৃষিজমিতে সেচের জন্য তাদের অধীনে রয়েছে কয়েক হাজার গভীর নলকূপ। তবে সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিমালিকানায়ও অসংখ্য নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো দিয়ে সেচসহ নানা কাজে পানি তোলা হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বিএমডিএ নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্ত এখনও বহাল থাকলেও ব্যক্তিমালিকানায় সেমিডিপ বসানো থামেনি। এখন শুধু কৃষিকাজ নয়, বাড়ি নির্মাণ, ক্ষুদ্র শিল্প এমনকি মাছ চাষের জন্যও সেমিডিপ ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিদ্যমান সেচ আইন অনুযায়ী বিএমডিএর আওতাভুক্ত এলাকায় ব্যক্তিমালিকানায় গভীর বা অগভীর নলকূপ বসানোর সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে উপজেলা সেচ কমিটিকে ম্যানেজ করে এসব নলকূপের অনুমোদন আদায় করা হচ্ছে। শুধু গত বছরই তানোর উপজেলায় ৩২টি সেমিডিপ স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তানোর উপজেলায় মোট সেচযন্ত্রের সংখ্যা ২ হাজার ১৯৫টি। এর মধ্যে বিএমডিএর গভীর নলকূপ ৫২৯টি, ব্যক্তিমালিকানার গভীর নলকূপ ১৬টি এবং বাকিগুলো অগভীর। তবে এর বাইরে অনুমোদনহীন প্রায় আড়াই হাজার সেমিডিপ চালু রয়েছে। রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানির ভয়াবহ সংকটের কারণে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৪ হাজার ৯১১ মৌজায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ বিষয়ে গত ৬ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়।

শুক্রবার সকালে নিহত শিশুর বাড়িতে যান তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান। তিনি জানান, বিএমডিএকে অবৈধ গর্তগুলো চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএমডিএর বোর্ড সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরক বলেন, ব্যক্তিমালিকানার নলকূপগুলো নিয়ম মেনে খনন ও পরিত্যক্ত গর্ত ভরাট করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন।

এ ঘটনায় তানোর থানায় জিডি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুজ্জামান। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন