আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা বাড়লেও সুষ্ঠু ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা নিয়ে এখনো তীব্র অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশেষত, পূর্ববর্তী ‘রাতের ভোটের’ অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনের ওপর শতভাগ আস্থাহীনতার কারণে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া এবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম মহানগরের জিইসি মোড়ের হোটেল পেনিনসুলার মিলনায়তনে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি বাস্তবায়নের আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় প্রায় শতাধিক নাগরিক এসব অভিমত তুলে ধরেন। সভার শুরুতেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আলোচনার সূচনা করেন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সভায় নাগরিকরা জানান, নির্বাচন ঘিরে অনাস্থা কাটাতে না পারলে জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক গ্রহণযোগ্য ভোট আয়োজন কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের দাবি নির্বাচন কমিশনকে সব দলের প্রতি সমান আচরণ, নিরপেক্ষতা, কঠোর নিরাপত্তা, ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন এবং হলুদ সাংবাদিকতা রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
স্থানীয় নাগরিকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই প্রাণবন্ত আলোচনায় উঠে আসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, প্রশাসনিক দুর্ব্যবস্থা, বাড়তি চাঁদাবাজি-দখলবাজি, নারীদের নিরাপত্তা সংকট এবং বন্দর পরিচালনা নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ। বন্দর বিশেষজ্ঞ আলী আকবর অভিযোগ করেন, “চট্টগ্রাম বন্দরকে বিনা প্রয়োজনেই বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।” ওমেন চেম্বারের পরিচালক রুহি মোস্তফা বলেন, “নারীরা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”
‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’—এমন প্রশ্নে ই-ভোটিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকরা যে বার্তা দেন তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা সংস্কার, দুর্নীতি দমন, সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা এবং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের দাবি।
দ্বিতীয় দফার ভোটে নাগরিকরা আরও জোরালোভাবে জানান, সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে কমিশনকে অবশ্যই সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সভার আলোচনায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটালেও আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন—এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক। এগুলো সঠিকভাবে না এগোলে জনআস্থা ফিরবে না।” তিনি আরও বলেন, “রাজনীতিবিদদের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশই নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত।”
তিনি মন্তব্য করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করায় জনগণ হতাশ হয়েছে। এতে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোও একই পথে হাঁটতে উৎসাহ পেতে পারে বলে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে অপকা’র নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর প্রশ্ন তোলেন, “আদৌ নির্বাচন হবে তো?” তার মতে, নির্বাচন ঘিরে জনগণের সংশয় কাটছে না, আর এমপিদের সম্পদের আলোচনায়ও স্বচ্ছতা অনুপস্থিত; কারণ তারা বহু সম্পদ আত্মীয়দের নামে রাখেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হুমাইয়া মুসফিকা পার্বত্য শান্তি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন দাবি করেন। তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি নাতাশা রহমান তাদের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ চেয়েছেন। বিবি আমেনা বলেন, “চাঁদাবাজি–দখলবাজি বেড়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।” স্থানীয়রা আরও দাবি করেন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, উন্নত গণপরিবহন, এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বছরে অন্তত একবার জনগণের মুখোমুখি হওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “দেশ এগোচ্ছে, তাই সংস্কার কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে। জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণ আবারও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।”
জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম জোনাল হেড মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, জামায়াত সরকার গঠন করলে তিন মাস, ছয় মাস ও এক বছর পর সরকার জনগণের মুখোমুখি হবে। তিনি নাগরিকদের সংস্কারের পক্ষে ভোট দিতে অনুরোধ করেন।
সবশেষে ড. দেবপ্রিয় বলেন, “বাংলাদেশ এখন দোলাচলের মুখে—একদিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা, অন্যদিকে গভীর আস্থাহীনতা। এই ব্যবধান কমাতে নাগরিকদেরই সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। সবকিছু সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না জবাবদিহিতার চাবিকাঠি থাকতে হবে নাগরিকদের হাতেই।”




