আমাদের চলাচলের কোনো পথই এখন আর নিরাপদ নয়। শত লেখালেখি, শত সতর্কতা সত্ত্বেও সব পথই কম বেশি নিরাপত্তাহীন। যাত্রীরা সতর্ক থাকলেও যানবাহন পরিচালনায় যারা রয়েছেন তারা কতটুকু সতর্ক তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ এবং প্রশ্ন রয়েছে। আর সেই প্রশ্নের সমাধান কবে মিলবে তা নিশ্চিত করতে পারছেন না কেউ।
বিশেষ করে দেশের সম্ভাবনাময় নৌপথে চলছে নৈরাজ্য-বাণিজ্য। যা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তবে এ কারণে নৌপথের যাত্রীরা যে কতটা নিরাপত্তাহীন আর অসহায় তা সম্প্রতি এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সহজেই বোঝা যায়। অথচ যাত্রীদের নির্বিঘ্নে, নির্ঝঞ্ঝাটে চলাচলের জন্য এই নৌপথ কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা বলা বাহুল্য।
মূলত, রেল, সড়ক বা বিমানপথের আগে নৌপথই ছিল আবহমান বাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান অবলম্বন। মানুষের চলাচল আর মাল পরিবহনে নৌপথের মতো এতো সহজ উপায় আর ছিল না। রেলপথ থাকলেও অনেক এলাকায় রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। সড়ক পথ থাকলেও সেখানে দুর্ঘটনা কম নয়। সেজন্য নৌপথেই ভরসা বাড়ছিল। অথচ আজ সেই নৌপথ হারিয়ে যেতে বসেছে। নাব্যসংকটের পাশাপাশি দুর্ঘটনা আর চালকদের দায়িত্বজ্ঞান হীনতার জন্য নৌপথ দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বলা যায় পুরোটাই নৌনির্ভর। জনগণের চলাচলসহ মালামাল পরিবহন সবকিছুই এই নৌপথে। তবে নৌপথের এই নির্ভরতাকে পুঁজি করে অনেকেই অবাধ নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। যা এই পথের যাত্রী সাধারণকে জিম্মি করে রেখেছে। ফলশ্রুতিতে এই পথে মানুষ হয়ে পড়েছে অসহায়। জিম্মি দশা থেকে মুক্তি মিলছে না সহজে।
প্রতিবছর দফায় দফায় প্রাণহানি ঘটলেও অনিয়ম আর অব্যস্থাপনার সুরাহা হচ্ছে না। অকাতরে জীবন দিতে হচ্ছে অসহায় মানুষকে। একের পর এক নানা দুর্ঘটনা ঘটলেও এর শেষ কবে তা কেউ বলতে পারছেন না। প্রতিবছর নৌপথে যথারীতি দুর্ঘটনা ঘটছে। শত শত যাত্রীর প্রাণ যাচ্ছে। গণমাধ্যমে ফলাও করে লেখা হচ্ছে। বহুমুখী তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। সেসব কমিটি মাঝে মধ্যে প্রতিবেদনও দিচ্ছে। পাতার পর পাতা পরামর্শ বা সুপারিশ দিয়ে যাচ্ছে। তবে সেসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া কিংবা দায়ীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টি তেমন চোখে পড়ে না।
এমন একটা অবস্থার মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযান নদীতে নামছে। ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী পারাপার করছে। অনেক নৌযানের আবার ফিটনেস নেই। সেসব দেখার জন্য যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা কতটা দায়িত্ব পালন করছেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। তবে কিছুদিন পর আবার সেই আগের অবস্থা। দেখে মনে হয়, এসব দেখার কেউ নেই। নৌপথে চলাচলকারী অনেক যানবাহনের যেমন ফিটনেস নেই, তেমনি রুট পারমিটও নেই। তারপরও অবৈধ এসব নৌযান কীভাবে চলাচল করে তা নিয়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও তৎসংশ্লিষ্ট বিভাগ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
অথচ নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌপথ আমাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। সঠিক পরিকল্পনায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে নৌপথ। সেক্ষেত্রে শুধু নৌযানের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নই নয় নৌপথের উন্নয়নও জরুরি। দেশের নদীগুলো ড্রেজিং-এর আওতায় এনে নৌপথ সচল করতে হবে। ড্রেজিং ব্যবস্থাপনার দুর্নীতি রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা ও বাধা আছে তা দূর করতে হবে। বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই সম্ভাবনাময় নৌপথকে আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
আনন্দবাজার/শহক




