বিগত শতকের মধ্যভাগে পারমাণিক গবেষণার মধ্য দিয়ে দেশে তথ্যপ্রযুক্তিখাতের সূচনা হয়েছিল। এরপর কয়েক দশক ধরে বৃহত্তম দেশি সংস্থাগুলোতে আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস করপোরেশনের কম্পিউটারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরপর নব্বই দশকে এসে খাতটির সম্প্রসারণ হতে থাকে। নানামুখী প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটতে থাকে। গত তিন দশকের ব্যবধানে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে এসেছে বিস্ময়কর গতি। নতুন নতুন প্রযুক্তিপণ্য উদ্ভাবন আর নাগরিক সেবার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি খাতের উন্নতির ফলে এ খাত বড় হতে থাকে। প্রযুক্তিসেবা পৌঁছে যেতে থাকে প্রান্তিক পর্যায়ে, ঘরে ঘরে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ কারিগরি খাত সমৃদ্ধ হতে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক যুগের অভিযাত্রায় তথ্যপ্রযুক্তিখাতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে গত এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তিখাতের সম্প্রসারণ বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। দক্ষ জনবলের তীব্র সংকটের মধ্যেও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অপার সম্ভাবনার তথ্য প্রযুক্তিখাত। একসেস টু ইনফরমেশনের (এটুআই) গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তিবান্ধব বহুমুখী সেবা উদ্ভাবনের ফলে ২০২১ সাল অবধি নাগরিকদের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সময় কমেছে ৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন দিন, খরচ ১১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার এবং যাতায়াত খরচ ৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
সূত্রমতে, করোনা মহামারির কারণে যখন বিশ্ব অর্থনীতিসহ স্থবির হয়ে পড়ে সব ধরনের কার্যক্রম, সে সময়েও প্রযুক্তিবান্ধব বিভিন্ন সেবা উদ্ভাবনের ফলে অব্যাহত থাকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যার সুফল সরাসরি ভোগ করে দেশবাসী। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইন ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, এটিএম কার্ড ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলা হচ্ছে তেমনি ই-গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে অপার সম্ভাবনার প্রযুক্তিখাত।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে বহুমুখী উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে দেশের ১৭ কোটি মানুষ। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধার কারণে ব্যবধান কমছে শহর-গ্রামের মধ্যে। এখাতে যেমন হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে তেমনি বৈদেশিক আয়ও বেড়েছে যাচ্ছে দিন দিন। বর্তমানে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের যুগে প্রবেশ করায় আরো একধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। দেশে তৈরি হচ্ছে ৩৯টি আইটি পার্ক। প্রতিমাসে প্রায় কোটি মানুষ বিভিন্নভাবে ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু তথপ্রযুক্তিখাতেই ৩০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান ও ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ থেকে এক যুগ আগে যেখানে বিদ্যুতের সংযোগ ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৬ লাখ, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ওয়েবসাইট ছিল মাত্র ১২-২০টি, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোথাও ছিল না ব্রডব্যান্ড, সেখানে এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে প্রযুক্তি সেবা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর দেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটিতে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অন্তত ২০ লাখ। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে রফতানি এক দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার। অনলাইন শ্রমশক্তিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রায় সাড়ে ছয় লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সার আউটসোর্সিং খাত থেকে প্রতিবছর আয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৭০০ মিলিয়ন ডলার। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মোবাইল ব্যাংকিং করছেন এখন ১০ কোটির বেশি মানুষ।
সূত্রমতে, দেশে বর্তমানে ৫২ হাজার ওয়েবসাইট, ৮২ হাজারের বেশি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, পৌরসভা ডিজিটাল সেন্টার, সিটি করপোরেশন ডিজিটাল সেন্টার নির্মিত হয়েছে। ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ডিজিটাল সার্ভিস, ডেলিভারি সেন্টার থেকে প্রতিমাসে সেবা নিচ্ছেন কোটি মানুষ। আয় করছেন সাড়ে ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) তথ্যমতে, এ খাতের প্রকল্পগুলোতে গত নভেম্বর পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে আইসিটি বিভাগের অধীনে ২৩টি উন্নয়ন, ৩টি কারিগরি ও একটি নিজস্ব প্রকল্পসহ মোট ২৭টি প্রকল্পের জন্য নিজস্ব অর্থায়নসহ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক হাজর ৪৫২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, আমাদের সক্ষমতা আছে। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ দক্ষতা নেই। এখনও আমাদের দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের আওতাটা এখনও অনেক কম। সরকার যদি সারাদেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ছড়িয়ে দিতে পারে তখন দেখা যাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা তা ব্যবহার করে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে পারবে। আর আমাদের যে সফটওয়ার টেকনোলজি ও হাইটেক পার্কগুলো তৈরি হচ্ছে সেগুলো যদি তাড়াতাড়ি শেষ করা যায় তাহলে সেখানেও দেশি-বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করতে পারবে।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, অদূর ভবিষ্যতে মানুষকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে। কিছু নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যেমন, মেশিন মানুষের কর্মক্ষেত্রকে সংকুচিত করবে, সস্তা শ্রমের চাহিদা কমে যাবে, অসমতা বৃদ্ধি পাবে এবং অভিবাসনকে উৎসাহিত করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমবে এবং প্রযুক্তিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়বে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো যার যার গতিতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে যদি প্রযুক্তি সহজলভ্য এবং সহজে হস্তান্তরযোগ্য না হয়।
তথ্য ও যোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে আর্থিক সেবায় মানুষের অন্তর্ভুক্তি রীতিমতো বিস্ময়কর। আইসিটির কল্যাণে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার না হয়ে ১০ কোটিরও বেশি নাগরিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল ওয়ালেটের মাধ্যমে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোর পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন করতে সক্ষম হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতি, অপচয় এবং হয়রানি দূর করার পাশাপাশি গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ ও নবীন-প্রবীণের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করে খুব সহজেই গন্তব্যে পৌঁছানো যায় এখন।
তথ্য প্রযুক্তিখাতের এই বাস্তবায়তায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা আন্তর্জাতিক শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে গবেষণা-উন্নয়ন এবং উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছি। নোকিয়া, স্যামসাং, হুয়াওয়েসহ অনেক কোম্পানি আমাদের হাই-টেক পার্কগুলোতে কাজ করছে। উৎপাদন খাতে আমরা ‘বৃত্তিয় অর্থনৈতিক মডেল’ গ্রহণ করছি। যার মাধ্যমে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ, পুনঃব্যবহারযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী পণ্য উৎপাদন শুরু করেছি।
আনন্দবাজার/শহক




