ঢাকা | শনিবার
৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

একদিন নয় প্রতিদিনই হোক নারীর সম্মান

‘না’ অক্ষরটি দিয়েই শুরু হয়েছে নারী শব্দটি। যার কারণে এই যুগে এসেও নারীকে শিকার হতে হয় নানা রকমের নির্যাতন কিংবা ‘না’ এর। বিভিন্ন কাজ করতেও নারীকে নিতে হয় অন্যের সিদ্ধান্ত। অথচ মানব সৃষ্টির একমাত্র মাধ্যম এই নারী হলেও তাদেরকে দেওয়া হয় না প্রকৃত সম্মান। এরই চিত্র হিসেবে বিভিন্ন সময় দেখা যায় নির্যাতন, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানিসহ নানা ঘটনা।
এই আমাদের কখনো মা, বোন, মেয়ে আবার কখনো স্ত্রী হিসেবে জীবনে আসে। নানা সম্পর্কের মাঝে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অন্যতম। এসব সম্পর্কের মানুষগুলো অন্যের সুখে হাসতে হাসতে বিলিয়ে দেয় নিজেকে। আর তাইতো সকল সমস্যা ও সমাধানের হালটিও কাঁদে তুলে নেয় তারা। এসব নানা চড়াই উতরাই করেই চলে এই নারীর জীবন। আর তাকে সম্মান জানাতে বিশ্বে একটি দিন পালিত হয়। তাহলো নারী দিবস। ৮ মার্চ এই দিনটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই জাতিসংঘের আহ্বানে এ দিনকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন করা হয়। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘সবার জন্য সমতা’। ১৮৫৭ সাল থেকে নারীরা অধিকার রক্ষার্থে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তা এখনো শেষ হয়নি। আজ একবিংশ শতাব্দীতেও এসেও সেই একই আন্দোলন করে যাচ্ছে তারা। এই দিনে নারীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে একটি দিন পালন করলেও প্রতি দিন কি তাদেরকে দেওয়া হয় সম্মান? কিন্তু বাস্তবে তারা সম্মান তো দূরের কথা প্রতিনিয়তই শিকার হয় নানা নির্যাতনের। পরিসংখ্যান দেখা যায়, ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি মেয়ে তার জীবনে কোনো না কোনো সময় পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর ৬২ শতাংশ স্বামী মনে করেন, স্ত্রীকে যুক্তিসংগত কারণে পেটানো তেমন কোনো মন্দ ব্যাপার নয়। এছাড়াও নিজের বাড়িতে চার ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় মেয়েরা। যেমন, শারীরিক (৯৩ শতাংশ), যৌন (১৩ শতাংশ), অর্থনৈতিক (৯১ শতাংশ) ও মানসিক (৮৪ শতাংশ)।
অতীতে পারিবারিক কাজে পুরুষের সুনির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে নারীরা সেসব দায়িত্ব সমভাবে পালন করছে। আজ শিক্ষা, মেধা মননে নারীরা গিয়েছে বহুদূর। উদ্যোক্তা ও ব্যবসা ক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে একজন আরেকজনকে টপকে। সর্বত্রই বিজয় নিশান উড়ায় এই নারীরা। বর্তমানে কৃষি, সেবা ও শিল্প খাতে কাজ করছেন ২ কোটি নারী। প্রতিনিয়তই ঘর সামলেও তাদের বাইরে বেরোতে হয় কর্মক্ষেত্রে। কারণ তাদের নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে। কিন্তু প্রতিনিয়ত নারীকে ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে। যেমন নগরে নারীর একা চলাচলে নিরাপত্তার অভাব, তেমনি কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নারীরা নানা রকম হয়রানির শিকার। কর্মস্থলে ৮৪ শতাংশ নারী শারীরিক, মানসিক, মৌখিক এবং যৌন হয়রানির শিকার হন।
এসব নারীরা বলেন, তারা অনেক সময় কর্তৃপক্ষ বা সুপারভাইজারের কাছ থেকে মা-বাবা তুলে গালাগালসহ নানা ভাবে মৌখিক নির্যাতনের শিকার হন। চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়েও মানসিক ভাবে নির্যাতন করা হয়। এছাড়া কাজের চাপ ও টার্গেট পূরণ এবং এই টার্গেট পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কারখানা থেকে বের হতে না দেওয়াকেও মানসিক নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ করেন। এদিকে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় পাবলিক বাসে চলাচলকারী ৪১ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন।
আজকের এই সময়ে দেশকে এগিয়ে নিতে নারীদের ভূমিকা গুরত্বপূর্ণ। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নারীর সক্ষমতা বাড়ানো, স্বাবলম্বী করা এবং নারীদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়ার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়নের মূল ধারায় নারীদের যুক্ত করতে হবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের হাজারও সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তাদের নিরাপদ কর্মস্থল এবং নিরাপদ যাত্রা। তাহলে হয়তো নারীরা আরও বেশি দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাবে। এজন্য শুধু আইন নয়- সমাজে নারীর গুরুত্ব প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার মানবসূচক উন্নয়নে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়েছে, জাতীয় অর্থনীতির জন্য যা ইতিবাচক। বাংলাদেশ শীর্ষ কর্মপদে নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান করেছে। সুশিক্ষার মাধ্যমে নারীরা নিজের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। আর মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত-ই নারীর সমতায়ন। সেই দিক থেকে আমাদের দেশেও প্রয়োজন নারীর সমতায়ন।
নগর বিশ্লেষকেরা বলছেন, শহুরে সৃজনশীল উৎপাদনে নারীরাও মুখ্য। নারীর প্রতিভা বিকাশে আরও সুযোগ দিতে হবে। আর যে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও ধীরগতি। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমেই নারী-পুরুষের সমতা আনয়ন সম্ভব। নারীরা ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনে সরব। শুধু তাই নয়, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জনে নারীকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। জাতীয় উন্নয়নকে টেকসই করতে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সমতা আনায়নে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিঙ্গ সমতা দূর করার দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় ৮ মার্চ। তবে এই দিনকে বিশেষ ভাবে পালন করা হলেও প্রতিটি দিনই তাদের জন্য পালন করা উচিত। কারণ তারা মানব সৃস্টির একমাত্র মাধ্যম। এছাড়াও আমাদের জাতীয় কবি অনেক আগেই বলেছেন, ‘অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পশ্চাৎপদতার অমানসিকতা কেটে নারীকে প্রতিটি জায়গা ও প্রতিটি দিন সম্মান জানিয়ে গড়ে উঠুক আমাদের এই সোনার বাংলা। ফিরে আসুক সবার জন্য সমতা। এই হোক আমাদের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: মোস্তফা রনি, সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন