বিয়ের আয়োজন ও নতুন জীবনের স্বপ্ন সব কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছিল। কিন্তু বাসররাতে কনের মুখ ধোয়ার পর মুহূর্তেই দৃশ্যপট বদলে যায়। বর রায়হান কবিরের অভিযোগ, বিয়ের আগে যে পাত্রী দেখানো হয়েছিল, বাসরঘরে বসে থাকা নববধূ সেই নারী নন; তিনি অন্য কেউ। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিয়ের আনন্দ সন্দেহ, উত্তেজনা ও মামলার জটিলতায় রূপ নেয়। ‘কনে বদল’ এর এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা এখন ঠাকুরগাঁও জেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঘটনাটি বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত বরকে কারাগারে যেতে হয়।
আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১ আগস্ট জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের সঙ্গে পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের বিয়ে হয়। ওই রাতেই বর ও তার পরিবার কনে বদলের অভিযোগ তোলেন। বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। পরে ২৮ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা করেন। এরপর ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করে পাল্টা মামলা করেন।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বরপক্ষের মামা বাদল বলেন, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাই মাসের শেষের দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঘটক একটি মেয়েকে দেখান। মেয়েটিকে পছন্দ হওয়ায় তারা বিয়ের সম্মতি দেন। পরে মেয়েপক্ষের লোকজন ছেলেপক্ষের বাড়িতে এসে আত্মীয়তার প্রস্তাব দেয় এবং নতুন করে মেয়ে না দেখিয়েই দ্রুত বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করার তাগিদ দেয়।
বাদল বলেন, ‘রায়হানের দুলাভাই মানিক মালয়েশিয়া প্রবাসী, তিনি দ্রুত বিদেশে ফিরে যাবেন বলে আমরা তাড়াহুড়ো করে বিয়ের কাজ শেষ করি। ১ আগস্ট রাতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভোরে বাড়ি ফিরি। অতিরিক্ত মেকআপের কারণে রাতে বিষয়টি বোঝা যায়নি। বাসররাতে মেয়ে মুখ ধোয়ার পর রায়হান বুঝতে পারে যে তাকে প্রতারিত করা হয়েছে। যে মেয়েকে আগে দেখানো হয়েছিল, তাকে কৌশলে বদল করা হয়েছে। এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানালে পরদিন ২ আগস্ট মেয়েটিকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’
কনের বাবা জিয়ারুল হক এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই। তিন মেয়ের মধ্যে মেজো মেয়ে জেমিন আক্তার রাণীশংকৈল মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তাকে ছেলেপক্ষ আমাদের বাসায় এসে দেখেই বিয়ে করেছে। ৭০ জন বরযাত্রীর সামনে বিয়ে হয়েছে, সেখানে কনে বদলের অভিযোগ হাস্যকর।’ জিয়ারুল আরও দাবি করেন, বিয়ের পরদিন বরের পরিবার ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। তিনি জমি বিক্রি করে টাকা দিতে চেয়েও সময় পাননি। এখন তাকে হেয় করতে কনে বদলের গল্প সাজানো হচ্ছে।
ঘটক মোতালেব বলেন, তিনি কোনো ভুল মেয়ে দেখাননি এবং পাত্রীর বাবার বাসাতেই মেয়ে দেখানো হয়েছিল। সব প্রক্রিয়া মেনেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ছেলেপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ছেলের অভিযোগ হলো প্রতারণা করে কনে বদল করা হয়েছে। আগে মীমাংসার শর্তে রায়হান কবির জামিনে ছিলেন। কিন্তু সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন বিচারাধীন। আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে বলে আমরা আশা করছি।’




