গন্তব্যে ছুটে চলেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ট্রেন। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ বাড়ছে বিভিন্ন আসনের নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী নিয়ে গঠিত ঢাকা–১৭ আসনেও চলছে নানা আলোচনা।
আকাশচুম্বী অট্টালিকার পাশাপাশি এখানে রয়েছে টিনের চালের বস্তি—সমাজের দুই প্রান্তের মানুষের সহাবস্থান এই আসনের নির্বাচনি আমেজকে করেছে বৈচিত্র্যময়। এখানে জিততে হলে যেমন দরকার অভিজাত শ্রেণির সমর্থন, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের ভোটও।
মাসখানেক আগ পর্যন্ত ঢাকা–১৭ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে ছিলেন একাধিক নেতা। তবে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দলের কাণ্ডারি তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বদলে যায় পুরো সমীকরণ। এখন এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান নিজেই। তারেক রহমানের প্রার্থী হওয়ার খবরে নির্বাচনি মাঠের চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে। সরকার গঠন করতে পারলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন নেতার প্রার্থী হওয়ায় ভোটারদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
নির্বাচনের ডামাডোল শুরুর আগ থেকেই এই আসনের অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান। শুরুতে বিএনপি জোট থেকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ প্রার্থী থাকায় জামায়াত প্রার্থী কিছুটা স্বস্তিতেই ছিলেন। দাঁড়িপাল্লার জয়ের বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন তার নেতাকর্মীরাও। তবে দৃশ্যপটে তারেক রহমানের আগমনে ধানের শীষের জোয়ারে কিছুটা চাপে পড়েছে দাঁড়িপাল্লা। তবুও আত্মবিশ্বাস হারাননি জামায়াত প্রার্থী, সমানতালে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় বিশ্বের বহু দেশের দূতাবাস থাকায় এখানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ বিরাজ করে। ফলে এলাকাটি প্রভাবশালী রাজনীতিক, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী শ্রেণির পছন্দের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
এর ঠিক পাশেই মহাখালী ও ভাষানটেক এলাকায় বিস্তীর্ণ বস্তিতে বসবাস করেন হাজারো স্বল্প আয়ের মানুষ। কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তি ঢাকা–১৭ আসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচনের সময় এসব বস্তির ভোটাররাই হয়ে ওঠেন বড় ফ্যাক্টর। অভিজাত ও সাধারণ—দুই শ্রেণির ভোটারকে সমানভাবে টানতে পারলেই মিলবে বিজয়।
এবার এই আসনের নির্বাচনি হিসাব আরও আলাদা। কারণ, জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়ে নিজের ও প্রয়াত মায়ের বাসার ঠিকানা—গুলশান-বনানীর এই আসন থেকেই প্রার্থী হয়েছেন তারেক রহমান। এতে অভিজাত এই আসনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
তারেক রহমানের প্রার্থী হওয়ায় উচ্ছ্বসিত এখানকার বিএনপি নেতাকর্মীরা। রাত-দিন এক করে তারা দলের চেয়ারম্যানের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে তারেক রহমান নিজেও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এ ছাড়া এখানেই দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয় থাকায় প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজারো কর্মী-সমর্থক।
আগামীর প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে পাওয়ার আশায় ভোটারদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আলাদা উদ্দীপনা। বিশেষ করে বস্তিবাসীদের মধ্যে প্রত্যাশা আরও বেশি। তাদের আশা, তারেক রহমান নির্বাচিত হলে কড়াইল ও সাততলা বস্তির মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।
এ বিষয়ে কড়াইল বস্তির কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা তারেক রহমানের প্রার্থী হওয়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। রিকশাচালক শাহজাহান মিয়া বলেন, তারেক রহমান নির্বাচিত হলে ভালোই হবে। তিনি ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হবেন—এই বিশ্বাস থেকেই আমরা তাকে ভোট দিতে চাই এবং তার কাছ থেকে বেশি আশা করি।
একই মত দেন চা দোকানদার আবদুস সামাদ। তিনি বলেন, তার দোকানে আসা দিনমজুর ও বস্তিবাসীদের মুখে এখন শুধু নির্বাচন নিয়েই আলোচনা। তার মতে, তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় এখানে বিএনপির সঙ্গে কেউ পাল্লা দিতে পারবে না।
প্রায় দুই দশক ধরে কড়াইল বস্তিতে বসবাস করা রিকশাচালক আব্দুল আলিম বলেন, বারবার ভোট দিয়েও বস্তিবাসীরা তেমন সুফল পায়নি। এবার তারা এমন জনপ্রতিনিধি চান, যিনি বস্তির উন্নয়ন, অগ্নিকাণ্ডসহ দৈনন্দিন সমস্যাগুলো সমাধানে বাস্তব উদ্যোগ নেবেন।
বস্তিবাসীদের চাওয়া খুব বেশি নয়—ভোটে জয়ের পর নিয়মিত খোঁজখবর নিলেই তারা সন্তুষ্ট। আগের প্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করেননি বলেই এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা আরও সচেতন হতে চান।
অন্যদিকে, গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকার ভোটারদের ভাবনাও উঠে এসেছে। স্থানীয় তরুণ ভোটার জাহিদুর রহমান বলেন, এবার তিনি এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান, যিনি তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা করবেন। তার মতে, শিক্ষিত তরুণরা চাকরির অভাবে হতাশ হয়ে বিদেশমুখী হচ্ছে। তাই দল নয়, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিই হবে তাদের ভোটের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।




