শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো গ্রুপের তিনটি কোম্পানি—বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডে দীর্ঘদিন ধরে পর্ষদ সভা না হওয়ায় কড়া অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সব পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবকে অবিলম্বে পর্ষদ সভা আহ্বানের নির্দেশ দিয়েছে। কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, আগামী ১২ কর্মদিবসের মধ্যেই এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
নিয়মিত বোর্ড সভা না হওয়ায় কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক করপোরেট কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডিভিডেন্ড ঘোষণা, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো আইনি বাধ্যবাধকতা দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতেই এই ব্যতিক্রমী নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) জারি করা বিএসইসির আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট তিনটি কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং ত্রৈমাসিক আর্থিক হিসাব নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো লিমিটেড এখনো ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেয়নি, পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের কোনো ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়নি। একই ধরনের অনিয়ম বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকসের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়েছে।
এই তিন কোম্পানির বিরুদ্ধে আলাদাভাবে কেন এমন কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হলো—এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল এবং এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। সম্প্রতি আপিল বিভাগ সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় কমিশনের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পুনরায় কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলেই নির্দিষ্টভাবে এই তিনটি কোম্পানিকে পর্ষদ সভা আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কমিশন আইন অনুযায়ী অন্যান্য অনিয়মকারী কোম্পানির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে পর্ষদ পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হলেও পর্ষদ সদস্যদের বিরুদ্ধে সাধারণত এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নামমাত্র জরিমানা আরোপ করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের তিন থেকে পাঁচ বছর পর নির্ধারিত হয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—এই জরিমানার বড় অংশই শেষ পর্যন্ত আদায় হয় না।
অনাদায়ী জরিমানা আদায়ের জন্য কমিশনকে বছরের পর বছর সার্টিফিকেট মামলা পরিচালনা করতে হয়, যেখানে মামলা পরিচালনার খরচেই সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। ফলে সময়োপযোগী ও কার্যকর আইন প্রয়োগ ছাড়া শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




