ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ডিবি পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের আপত্তি মঞ্জুর করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের নারাজি আবেদন গ্রহণ করে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ আদেশ দেন।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, আদালত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) মামলাটি পুনঃতদন্ত করে আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, হাদি হত্যা মামলায় গত ৬ জানুয়ারি ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। এ কারণে অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য শুনানিতে বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন দাখিল করে।
এর আগে গত সোমবার মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। সে সময় বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান, যা আদালত মঞ্জুর করেন। বৃহস্পতিবার অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও সেদিন বাদীপক্ষ অভিযোগপত্রে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি আবেদন করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল শুনানিতে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা কেবল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। এতে হত্যার পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি শুটারদের পারস্পরিক সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়নি। তিনি বলেন, হাদি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পেছনে বড় ধরনের পরিকল্পনা ছিল, যাতে ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কেউ আর কথা বলার সাহস না পায়।
আইনজীবী আরও বলেন, অভিযোগপত্রে আওয়ামী লীগের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা হাস্যকর। একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পক্ষে এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটন সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, তদন্তে কেবল একজন আসামিকে সামনে আনা হয়েছে এবং কিছু ব্যাংক চেক জব্দ করাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার পর আসামিরা কীভাবে নিরাপদে পালাল, কারা তাদের সহায়তা করেছে—এসব বিষয় অভিযোগপত্রে নেই।
তিনি বলেন, হাদি জীবদ্দশায় বারবার ন্যায়বিচারের কথা বলতেন এবং মৃত্যুর পরও সেই ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করতেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থেই এই নারাজি আবেদন করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা হাদিকে মাথায় গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। পরবর্তীতে থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।
ডিবির অভিযোগপত্রে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদসহ পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও হাদির রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণে প্রাথমিকভাবে ধারণা পাওয়া গেছে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যেও এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।




