ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে এবং দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে হত্যাকাণ্ডের পেছনের জটিল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা মিললেও তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা আগ্নেয়াস্ত্রগুলো আসে এক ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তির গোপন আস্তানা থেকে। ওই আস্তানা থেকে মোট পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র বের করা হয়েছিল ঘটনার অন্তত ১৫ দিন আগে। এর মধ্যে দুটি অস্ত্র সরাসরি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয় এবং বাকি তিনটি রাখা হয়েছিল ব্যাকআপ হিসেবে।
হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এসব অস্ত্রের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অস্ত্রগুলো সরবরাহ ও ফেরত নেওয়া হয় তথাকথিত ‘কাটআউট’ পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতিতে অস্ত্র একাধিক হাত ঘুরে শুটারদের কাছে পৌঁছায় এবং বাহকরা একে অপরকে চিনতে পারে না। ফলে অস্ত্রের উৎস বা গন্তব্য সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত তথ্য জানে না।
সূত্র আরও জানায়, গোপন আস্তানা থেকে বের করার পর অস্ত্রগুলো কয়েক দফা হাতবদল হয়ে কিলিং মিশনের ঠিক আগে শুটারদের কাছে পৌঁছায়। কাজ শেষ হওয়ার পর একইভাবে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অস্ত্রগুলো ফেরত নেওয়া হয়। এ কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক অভিযান চালিয়েও অস্ত্র উদ্ধারে সফল হতে পারেনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
তদন্তে উঠে এসেছে, মুছাব্বির হত্যার বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ের এক রাজনৈতিক নেতার সম্মতির ইঙ্গিতও ছিল। পরিকল্পনার কথা আগে থেকেই জানলেও তিনি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের। বরং এতে করে প্রভাবশালী ব্যক্তিকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। কাওরান বাজার ও আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে বাধা হয়ে উঠেছিলেন মুছাব্বির।
এই প্রভাবশালীর পক্ষে মাঠপর্যায়ে কাজ করতেন স্থানীয় এক নেতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পারদর্শী আরেক ব্যক্তি। তারা দুজনই তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। এছাড়া হত্যামিশন বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে ও আড়ালে বিভিন্ন স্তরের অনেকেই সক্রিয় ছিল বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রভাবশালী ব্যক্তি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও সতর্কভাবে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। মিশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্লু রাখতে চান না তিনি। অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও সব সময় কাটআউট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অস্ত্র বহনের সময় বাহকদের মুখ ঢেকে রাখা হয়, যাতে কেউ কাউকে শনাক্ত করতে না পারে।
গোয়েন্দাদের মতে, এই পদ্ধতিতে কাজ করায় বাহকরা অস্ত্রের ব্যবহার বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারে না। মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে কিলিং মিশন শেষ হলেও অস্ত্রগুলো আবার নিরাপদে গোপন আস্তানায় ফিরে গেছে।
যদিও এখনো প্রভাবশালীর মূল আস্তানার সন্ধান মেলেনি, তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে—রাজধানীর পার্শ্ববর্তী একটি এলাকায় তার এক সহযোগীর মালিকানাধীন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই স্থানেই তিনি দেশে থাকাকালে রাত্রিযাপন করেন। বেশির ভাগ সময় তিনি বিদেশে অবস্থান করেন এবং বড় কোনো ঘটনার সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশের বাইরে থাকেন।
মুছাব্বির হত্যার সময়ও তিনি বিদেশে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, দেশের বাইরে যাওয়ার আগেই সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে যান তিনি, যাতে ঘটনার পর তাকে কেউ সন্দেহ করতে না পারে।
উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে কাওরান বাজারের বিপরীতে স্টার কাবাবের গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন মুছাব্বির। ওই ঘটনায় কাওরান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ওরফে মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন এবং বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানান, তদন্তে দুজন শুটারের মাধ্যমে দুটি অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।




