ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন বছরে খাদ্যপণ্যের স্বস্তির আভাস

নতুন বছরে সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা থাকে খাদ্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা। সীমিত আয়ের মধ্যে পরিবার পরিচালনার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রত্যাশা পূরণে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত মিলছে।

২০২৫ সালের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য কমার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংকের নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিকভাবে পণ্যমূল্য গড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে পণ্যমূল্য আরও ৭ শতাংশ কমতে পারে, যা হবে গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ যেহেতু খাদ্যপণ্য ও কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর, তাই বিশ্ববাজারের এই মূল্যহ্রাসের প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়বে। চলতি বছরের শেষ ভাগেও কৃষিপণ্য, খাদ্য ও কাঁচামালের দামে কিছুটা কমতি লক্ষ্য করা গেছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে দেশে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কৃষি উৎপাদন ভালো হয়েছে। ফলে গম, ভুট্টা ও মসলাজাতীয় ফসলের দাম বর্তমানে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর সুফল শিগগিরই বাংলাদেশের ভোক্তারাও পেতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালে দেশে আমন ও আউশের ফলন ভালো হয়েছে এবং তুলনামূলক কম দামে গম আমদানি করা যাচ্ছে। তাই দানাদার খাদ্য নিয়ে এখনই কোনো উদ্বেগ নেই। আসন্ন বোরো মৌসুমেও ভালো উৎপাদন হলে ২০২৬ সাল সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা করা যায়। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সেলিম রায়হান বলেন, অনেক সময় বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন ঘটে না। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, শুল্ক ও করের চাপ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার কারণে এমনটি হয়। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে অতি মুনাফা ও অস্বচ্ছ বাণিজ্য ব্যবস্থার কারণেও কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ে। এসব সমস্যা সুশৃঙ্খল করা গেলে ২০২৬ সালে ভোক্তারা প্রকৃত অর্থেই স্বস্তি পেতে পারেন।

খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড বাংলাদেশ

দেশের খাদ্য উৎপাদনের চিত্রও আশাব্যঞ্জক। প্রথমবারের মতো ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে চার কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়। ওই বছর চাল উৎপাদন ছিল চার কোটি ছয় লাখ টন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে দাঁড়ায় চার কোটি ১৯ লাখ টনে।

গত অর্থবছরে দেশে বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে দুই কোটি ২৬ লাখ টন, আমন এক কোটি ৬৫ লাখ টন এবং আউশ ২৮ লাখ টন। পাশাপাশি গম উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ টন এবং ভুট্টা ৭৪ লাখ টন। সব মিলিয়ে দানাদার খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি তিন লাখ টনে, যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাঁচ কোটি টনের সীমা ছাড়িয়েছে।

চলতি মৌসুমেও ভালো ফলনের আশা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমন চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। সংস্থাটির তথ্যমতে, এ মৌসুমে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে গড়ে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ১১ টন হিসেবে প্রায় এক কোটি ৬১ লাখ টন উৎপাদন পাওয়া গেছে।

ডিএইর ফিল্ড উইংয়ের পরিচালক মো. ওবাদুর রহমান মন্ডল জানান, এ বছর আমন ও আগের আউশ—দুই মৌসুমেই বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির প্রয়োজন পড়েনি। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় অধিকাংশ ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে এবং চালের মজুতও বাড়ছে।

সব মিলিয়ে দেশি উৎপাদন, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে নতুন বছরে খাদ্যপণ্যের দামে স্বস্তি পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন