ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রথম নির্বাচনের আগেই টালমাটাল পরিস্থিতিতে এনসিপি

নির্বাচনের মাঠে নামার আগেই বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে তৈরি হওয়া মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য বিভক্তিতে রূপ নিয়েছে। একের পর এক শীর্ষ নেতার পদত্যাগ ও নিষ্ক্রিয়তায় প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া দলটি কার্যত দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে।

ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রত্যাশিত প্রস্তুতি নিতে পারেনি। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের সংগঠন, নির্বাচন কৌশল ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি দাঁড়ায়নি।

দলীয় সূত্র জানায়, গত দুই সপ্তাহেই অন্তত ১৫ জন জ্যেষ্ঠ নেতা দল ছাড়েন। এদের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, ইশতেহার কমিটি এবং নীতি ও গবেষণা শাখার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা রয়েছেন। ফলে নির্বাচন সামনে রেখে যে পরিকল্পনাগুলো এগোনোর কথা ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই স্থবির হয়ে পড়েছে।

কয়েকজন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও কার্যত দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে সরে গেছেন। এতে মিডিয়া, প্রচার, অফিস ব্যবস্থাপনা ও আইসিটি সেলসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে তৃণমূল নেতারা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যকে এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “এখন নিয়মিত দলীয় কাজ চালানোই কষ্টকর হয়ে গেছে। খুব সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চলছে।”

তার মতে, নির্বাচনের আর ৪০ দিনেরও কম সময় থাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ নেই। ফলে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির পরিবর্তে এখন তাৎক্ষণিক কৌশলেই জোর দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব নেতৃত্ব সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শূন্যতা কাটাতে নতুন করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হচ্ছে এবং ইশতেহার তৈরির কাজও এগোচ্ছে। আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত হলেই ইশতেহার প্রকাশ করা হবে।

আরিফুল জানান, সাবেক উপদেষ্টা ও সদ্য নিযুক্ত দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। তার সঙ্গে কথা বলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দল এক বিবৃতিতে জানায়, আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়েছে।

নির্বাচন তদারকির পাশাপাশি তিনি এখন মিডিয়া, প্রচার ও প্রকাশনা, ব্র্যান্ডিং, অফিস ব্যবস্থাপনা, জনসংযোগ, সদস্য সংগ্রহ এবং গবেষণা ও নীতি শাখাসহ একাধিক সেলের দায়িত্বে থাকবেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটের সমন্বয়ের দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়েছে।

জোট নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রকট হয়ে ওঠে। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তাসনিম জারা পদত্যাগ করেন। একই পথে হাঁটেন পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ, যিনি ইশতেহার প্রণয়নের মূল দায়িত্বে ছিলেন।

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, খালেদ সাইফুল্লাহ চলে যাওয়ার পর ইশতেহার কমিটির কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় নতুন করে কাজ শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কমিটির অন্য সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী ব্যস্ততায় থাকায় অচলাবস্থা আরও বেড়েছে।

পদত্যাগের ফলে মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, অফিস সেলের প্রধান সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং কৃষক উইংয়ের মুখ্য সমন্বয়ক আজাদ খান ভাসানীর মতো নেতারাও দল ছেড়েছেন।

নারী নেতৃত্বেও এর প্রভাব পড়েছে। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর দলীয় কর্মকাণ্ড থেকেও দূরে রয়েছেন। সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন, দক্ষিণাঞ্চল সংগঠক মনজিলা ঝুমা, উত্তরাঞ্চল সংগঠক দ্যুতি অরণ্য চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করেছেন বা নিষ্ক্রিয় হয়েছেন।

এক জ্যেষ্ঠ নেতা মন্তব্য করেন, “দুই মাস আগে জোটের সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হলে এনসিপি অন্তত ২০–২৫টি আসনে শক্ত অবস্থান নিতে পারত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়টা নষ্ট হয়ে গেছে।”

আগামী দিনগুলোতে এনসিপির কৌশল হবে অবশিষ্ট সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার, দ্রুত প্রচারণা জোরদার এবং বিদ্যমান সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যতটা সম্ভব প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যাওয়া।

গণঅভ্যুত্থানের কেন্দ্র থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপি শুরু থেকেই রাজনৈতিক সংস্কার, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের অবসান এবং টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে এসেছে। তবে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে দলটি সেই আদর্শ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন