ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কেন যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট হলো ভেনেজুয়েলা?

বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্রে আবারও উঠে এসেছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুত দেশটিকে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার শীর্ষে তুলেছে, তেমনি পরাশক্তিদের ভূরাজনৈতিক আগ্রহের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত করেছে। এই বিপুল তেলসম্পদই এখন ভেনেজুয়েলার জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্রভাবশালী সাময়িকী অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের হিসাব শেষে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব (২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল) এবং তৃতীয় ইরান (২০৮ বিলিয়ন ব্যারেল)। এরপর পর্যায়ক্রমে কানাডা, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও লিবিয়ার অবস্থান।

ওপেকের হিসাব বলছে, বৈশ্বিক মোট তেল মজুতের প্রায় ২০ শতাংশই রয়েছে ভেনেজুয়েলার দখলে। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের এক ব্যারেল রয়েছে এই দেশটির ভূগর্ভে। মজুতের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ভেনেজুয়েলার তেলের পরিমাণ পাঁচ গুণেরও বেশি।

এই বাস্তবতাই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর দীর্ঘদিনের অভিযোগের পেছনে মূল যুক্তি হিসেবে উঠে আসে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের লক্ষ্যেই নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ ও সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে চলেছে। ওয়াশিংটনের পাল্টা বক্তব্য ছিল—মাদুরো প্রশাসন মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান ও গ্যাং সহিংসতার সঙ্গে জড়িত এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

এই উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামে একটি আকস্মিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

অভিযানের পর ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার রদবদল না হওয়া পর্যন্ত দেশটির প্রশাসনিক ও তেল উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল খাত ব্যর্থতায় ভরা এবং মার্কিন বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করে অবকাঠামো পুনর্গঠন করবে।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের সন্দেহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাদক বা গ্যাং ইস্যুর চেয়ে তেলই যে মূল লক্ষ্য, তা সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার হয়ে যায়।

স্কাই নিউজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হলেও দেশটি মূলত হালকা অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। বিপরীতে, দেশটির বহু পরিশোধনাগার ভারী অপরিশোধিত তেলের জন্য তৈরি, যার সবচেয়ে বড় উৎস ভেনেজুয়েলা। ভৌগোলিক নিকটতা, কম পরিবহন ব্যয় ও দ্রুত সরবরাহ—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৬ সালে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প জাতীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিভিএসএ গঠিত হয়। হুগো চাভেজ ও পরবর্তী সময়ে মাদুরোর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়, যার ফলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই প্রেক্ষাপটে শেভরন ছাড়া আর কোনো বড় মার্কিন কোম্পানি সেখানে টিকে থাকতে পারেনি।

নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সংকটে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। একসময় যেখানে দৈনিক উৎপাদন ছিল সাড়ে তিন মিলিয়ন ব্যারেল, সেখানে তা নেমে আসে এক মিলিয়নের নিচে। অথচ এক সময় যুক্তরাষ্ট্রই ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা।

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ভেনেজুয়েলার নতুন নেতৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী পরিচালিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা চালানো’ মানে হলো—নতুন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভাণ্ডারের মালিক দেশটি কি এবার সরাসরি পরিণত হচ্ছে একটি পরাশক্তির প্রভাবাধীন রাষ্ট্রে? কারাকাসে কি গড়ে উঠতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন-সমর্থিত একটি নতুন শাসনব্যবস্থা, যার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে থাকবে ভেনেজুয়েলার তেল?

সংবাদটি শেয়ার করুন