গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাপ্ত উপাত্তে প্রমাণিত হয়েছে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। অনেক গুমের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা নিজেই নির্দেশদাতা ছিলেন।
গুমসংক্রান্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশে প্রায় ৬ হাজার ব্যক্তি গুম হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া তদন্তকালে নিশ্চিত হয়েছে, গুমের পর ২৮৭ জন মারা গেছেন। গুমের শিকারদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে ৬১ শতাংশের। হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের গুম করা হয়েছে তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে, অনেককে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের শিকারদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের।
প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রোববার জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের আগেও তিন দফায় আংশিক রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জমাদানের সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্যরা বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন। বিশেষত বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান অন্তর্ভুক্ত। গুম সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসারে র্যাব, পুলিশ, ডিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।
তদন্তে দেখা গেছে, গুমের শিকারদের মধ্যে যারা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের। গুমের অভিযোগ জমা দেওয়ার আহ্বান জানানোর পর ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ কমিশনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগকে সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তদন্তে বরিশালের বলেশ্বর নদী, বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সীগঞ্জে হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা বেশি পাওয়া গেছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই কমিশনের কাজ ঐতিহাসিক, এবং যারা গুমের শিকার হয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতা ও ঘটনার বর্ণনা শুনে প্রকৃতপক্ষে নৃশংসতার পূর্ণ চিত্র জানা গেছে। কমিশন নিশ্চিত করেছে, এসব ঘটনা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দেশের ইতিহাসে দাগ রেখে গেছে।




