ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গুম কারণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: তদন্ত কমিশন

বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলোর পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল—এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে এই প্রতিবেদন তুলে দেয় কমিশন।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, কমিশনের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—গুম একটি ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম’। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাপ্ত ডেটা থেকেই এই অপরাধের রাজনৈতিক চরিত্র স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

কমিশন সূত্রে জানা যায়, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়লেও যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ শ্রেণিতে পড়েছে।

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, বাস্তবে গুমের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। তার মতে, এই সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, কেউ বিদেশে চলে গেছেন, আবার অনেকে ভয় বা অনিচ্ছার কারণে অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে। জীবিত ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে, এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানায় কমিশন। উল্লেখযোগ্য ভিকটিমদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

কমিশনের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কিছু গুমের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে বেআইনি রেন্ডিশনের প্রমাণও মিলেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহসিকতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এই রিপোর্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়ের দলিল। গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে মানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে—এই নথি তারই প্রমাণ।

তিনি আরও বলেন, এসব নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, সে জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে রিপোর্টটি সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা কমিশনকে ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশমালা উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি আয়নাঘর ছাড়াও যেসব স্থানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুম করা হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে ম্যাপিং করার নির্দেশনা দেন।

কমিশনের তদন্তে জানা গেছে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জ এলাকাতেও লাশ গুমের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ও নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা ছাড়া এই তদন্ত সম্ভব হতো না বলে কমিশনের সদস্যরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন, ভিকটিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সংবাদটি শেয়ার করুন