ঢাকা | শনিবার
৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জামায়াতের সাথে জোটে গিয়ে ভাঙনের মুখে এনসিপি

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন এক গভীর সাংগঠনিক ও আদর্শিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির ভেতরে এমন এক টানাপোড়েন তৈরি করেছে, যার ফলশ্রুতিতে একের পর এক শীর্ষ নেতা দল ছাড়ছেন এবং গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি বনাম নির্বাচনী বাস্তবতার প্রশ্নে দলটি স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

নির্বাচন, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কার—এই তিন প্রশ্নে দীর্ঘদিন ঐক্যবদ্ধ থাকলেও নতুন বছরের শুরুতেই এনসিপির ভেতরে আদর্শিক দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটের প্রশ্নে ভিন্নমত এখন প্রকাশ্য। যদিও দলটির বর্তমান নেতৃত্ব আশাবাদী, এই সংকট কাটিয়ে তারা সামনে এগোতে পারবেন।

গত ৭ ডিসেম্বর এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠিত হয়। কিন্তু সেই জোট ঘোষণার এক মাস না যেতেই ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয় এনসিপি। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই দলটির ভেতরে অস্বস্তি ও বিরোধের সূত্রপাত হয়।

জোটে যোগ দেওয়ার পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, বাংলাদেশে এখনও আধিপত্যবাদী শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চলছে। এসব পরিস্থিতিতে বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যাওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি মূলত নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার একটি কৌশল।

তবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এই সমঝোতাকে কেবল নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবে দেখেননি। তার মতে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জোট, যা নির্বাচন, দেশ গঠন এবং জাতীয় ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।

এনসিপির দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে অন্তত ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন। তারা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে লিখিত চিঠি দিয়ে দলীয় আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে ধরেন। চিঠিতে ১৯৭১ সালে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা, বিভাজনমূলক রাজনীতি, নারী নেতাদের বিরুদ্ধে চরিত্র হননের অভিযোগ এবং সামাজিক ফ্যাসিবাদ উত্থানের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়।

দল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া একাধিক নেতা জানান, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই শক্তির সঙ্গে জোট করা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, ক্ষমতার সম্ভাবনায় দল আদর্শচ্যুত হচ্ছে এবং সেই অবস্থানের সঙ্গে আপস করা সম্ভব নয়। নৈতিকতা, সম্মান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জায়গা থেকেই তারা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তারা।

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কের পদ থেকে পদত্যাগ করা খান মুহাম্মদ মুরসালীন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল শ্রমিক, নারী, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের রক্তে লেখা এক ঐতিহাসিক আন্দোলন। সেই শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করতে ব্যর্থ হওয়াতেই আজ গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি হুমকির মুখে। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোকে একটি ধারাবাহিক দমননীতির অংশ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের জেরে এখন পর্যন্ত প্রায় ডজনখানেক নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডা. তাসনিম জারা, যিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন এবং ঢাকা-৯ আসনের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। দল ছাড়ার পর তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া তার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ, মুশফিক উস সালেহীন, তাজনূভা জাবীন ও খান মুহাম্মদ মুরসালীনসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেছেন।

অন্যদিকে, দলের ভেতরে থাকা কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, পদত্যাগকারীরা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ। তার মতে, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ জোট নয়, বরং সংস্কার, গণভোট এবং পুরোনো এস্টাব্লিশমেন্ট ভাঙার লক্ষ্যে একটি সীমিত সমঝোতা।

তাসনিম জারার পদত্যাগের পর এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বর্তমানে দলের মুখপাত্র এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান। তবে আরেক সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি এই এনসিপির অংশ হবেন না।

দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র নয় এবং তাদের সঙ্গে সমঝোতায় গেলে এনসিপিকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

সব সংকট ও বিভাজনের পরও নাহিদ ইসলাম, হাসনাত ও মাসুদসহ গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতারা দলে বহাল রয়েছেন এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে সক্রিয় আছেন। দলীয় নেতৃত্বের মতে, সামনে নির্বাচন, সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করাই এনসিপির বড় লক্ষ্য।

অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, পদত্যাগ আর আদর্শিক প্রশ্নের মধ্যেও এনসিপি এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি—গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রেখে নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকা এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের দাবি কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারে, সেটিই এখন দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন