ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যে প্রক্রিয়ায় মাদুরোর বিচার করবে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ঘটনার জন্ম দিয়েছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউইয়র্কে আনা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মাদক-সন্ত্রাসবাদসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে বিচার শুরু হতে যাচ্ছে, যা গ্রহণ করা হলে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মুখে পড়তে হতে পারে।

স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যায় মাদুরোকে বহনকারী একটি বিমান নিউইয়র্কের উপকণ্ঠের একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আদালতে হাজির করানোর আগপর্যন্ত তাঁকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হবে। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এই পুরো আইনি প্রক্রিয়া তদারক করছে এবং সম্ভাব্যভাবে সোমবার তাঁকে ফেডারেল আদালতে তোলা হতে পারে।

মাদুরোর গ্রেপ্তার ও যুক্তরাষ্ট্রে আনার বিষয়টি দেশটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদল আইনপ্রণেতা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবে তাঁরা এটাও স্বীকার করছেন, সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী রায় অনুযায়ী, একবার অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতের আওতায় এলে গ্রেপ্তারের পদ্ধতি বিচার কার্যক্রমকে সাধারণত থামাতে পারে না।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মাদুরো দীর্ঘদিন ধরেই একজন অবৈধ শাসক হিসেবে পরিচিত এবং সর্বশেষ নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। প্রশাসন এই সামরিক অভিযানের ব্যাখ্যা দিয়েছে একটি সাধারণ আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম হিসেবে, যেখানে বিচার বিভাগকে সহায়তা করতেই সেনাবাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে।

শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “এটি মূলত দুই পলাতক অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার একটি পদক্ষেপ।” একই দিন নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে মাদুরোর বিরুদ্ধে চার দফা অভিযোগনামা প্রকাশ করা হয়।

অভিযোগনামায় বলা হয়েছে, মাদুরো, তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মাদক-সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখার অভিযোগ।

প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মাদক থেকে অর্জিত অর্থ সহিংস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হয়েছে, যারা ভেনেজুয়েলার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছে। অভিযোগে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের প্রতিটি ধাপে কোকেনের বাড়তি দামের সুবিধা এই নেটওয়ার্ক ভোগ করেছে।

এই বিচার প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশে পরিচালিত একটি নজিরবিহীন সামরিক অভিযান, যার মাধ্যমে রাতারাতি ভেনেজুয়েলায় ঢুকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেল “চুরি” করেছে এবং উত্তরাধিকার নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত দেশটির প্রশাসনিক দায়িত্ব আমেরিকা সাময়িকভাবে দেখবে—যদিও এই অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিক অভিযোগনামায় নেই।

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই যুক্তির কড়া সমালোচনা করেছেন। সিনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্সের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক আর ওয়ার্নার সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের নজির বিশ্বব্যবস্থায় ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে এবং স্বৈরশাসকেরা এটি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রশ্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে বড় প্রভাব ফেললেও মার্কিন আদালতে মাদুরোর বিচার থামানোর সম্ভাবনা কম। টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সাবেক সামরিক আইন উপদেষ্টা জিওফ্রে কর্ন বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বহু পুরোনো রায় অনুযায়ী, অপহরণ বা অবৈধভাবে আনার যুক্তিতে আদালতের এখতিয়ার অস্বীকার করা যায় না—যদিও তিনি এই অভিযানের আইনি ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেছেন।

হার্ভার্ড ল স্কুলের অধ্যাপক জ্যাক গোল্ডস্মিথও পানামার সাবেক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগার উদাহরণ টেনে বলেন, অতীতেও এ ধরনের বিতর্ক উঠেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালত সরকারের বিচার করার অধিকার বহাল রেখেছিল।

বর্তমান অভিযোগনামাটি মূলত ২০২০ সালে করা মামলার হালনাগাদ সংস্করণ। নতুন করে এতে মাদুরোর স্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠ বৃত্তের আরও কয়েকজন সদস্যের নাম যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে তাঁর ছেলে নিকোলাস আর্নেস্তো মাদুরোও রয়েছেন, যদিও তাঁকে আটক করা হয়নি।

সব মিলিয়ে, একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনের ইতিহাসে নতুন বিতর্কের দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিচার কেবল আদালতকেন্দ্রিকই থাকবে, নাকি এর ঢেউ বিশ্ব কূটনীতির মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন আনবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন