ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ক্ষুদ্র ও মাঝারি মূলধনী কোম্পানির প্ল্যাটফর্ম বা এসএমই বোর্ডকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো বিনিয়োগকারীর সেকেন্ডারি মার্কেটে মাত্র ১০ লাখ টাকার পোর্টফোলিও থাকলেই তিনি এসএমই বোর্ডে লেনদেনের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত কমিশনের ৯৯০তম সভায় এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে এই বিনিয়োগের সীমা ছিল ৩০ লাখ টাকা, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এখন থেকে দেশি কিংবা বিদেশি—যেকোনো বিনিয়োগকারী ডিএসইর সেকেন্ডারি মার্কেটে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকার শেয়ার ধারণ করলেই ‘কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর’ হিসেবে এসএমই বোর্ডে কেনাবেচা করতে পারবেন। এই পরিবর্তন কার্যকর করার লক্ষে বিএসইসি তাদের ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের পুরনো নির্দেশিকাটি সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মূলত বাজারের গভীরতা বাড়ানো এবং তারল্য সংকট নিরসনেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিএসইসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত কমিশনের সময়ে আইনের মূল বিধিমালার সঙ্গে জারি করা নির্দেশনার যে অসামঞ্জস্য ছিল, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। বর্তমান কমিশন সেই আইনি জটিলতা নিরসন করে বিধিমালার সঙ্গে নির্দেশনার পূর্ণ সামঞ্জস্য ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করে বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছতার সঙ্গে এসএমই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন করতে পারবেন।
তথ্যমতে, ২০১৮ সালের মূল বিধিমালায় ক্ষুদ্র মূলধনী কোম্পানিতে বিনিয়োগের সীমা ১০ লাখ টাকাই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তৎকালীন কমিশন প্রধান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের অধীনে একটি পৃথক আদেশের মাধ্যমে এই সীমা বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করা হয়। আইনের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই সিদ্ধান্তের ফলে এসএমই বোর্ডের লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায় এবং তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করে। বর্তমান কমিশন এখন পুনরায় মূল বিধিমালার ১০ লাখ টাকার শর্তটি কার্যকর করার মাধ্যমে সেই স্থবিরতা কাটানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
৫ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর জন্য তৈরি এই বিকল্প ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ৩০ লাখ টাকার শর্তটি কেবল আইনগতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল না, বরং এটি ক্ষুদ্র কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় বিনিয়োগকারীদের সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ করে দিয়েছিল। এখন বিনিয়োগের সীমা কমিয়ে আনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে, যা নিস্তেজ হয়ে থাকা এসএমই বোর্ডে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করবে।
২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকেই এসএমই বোর্ড বারবার নীতিগত পরীক্ষার শিকার হয়েছে। শুরুতে বিনিয়োগের ন্যূনতম সীমা ৫০ লাখ টাকা থাকলেও ধাপে ধাপে তা ২০ লাখ এবং পুনরায় বাড়িয়ে ৩০ লাখ করা হয়েছিল। এই অস্থিতিশীল নীতির কারণে ২০২৫ সালে এসএমই সূচক ‘ডিএসএমইএক্স’ প্রায় ২১ শতাংশ ধসে পড়ে এবং দৈনিক গড় লেনদেন মাত্র ৫ কোটি টাকায় ঠেকে। নতুন বছরের শুরুতেই বিএসইসির এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ২০২৬ সালে এসএমই বোর্ডকে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা।




