লাতিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করে নিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে দুটি বিষয়—এই ঘটনায় বৈশ্বিক তেলের দামে কী প্রভাব পড়বে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) হিসাবে, ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বৈশ্বিক মোট তেল মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ইরাকসহ অনেক বড় তেল উৎপাদনকারী দেশের চেয়েও বেশি এই মজুত ভেনেজুয়েলার রাজনীতি ও অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করে আসছে।
তবে তেলের দামে তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো দেখা যায়নি। সপ্তাহান্তে ফিউচার বাজার বন্ধ থাকায় বাজারের পূর্ণ প্রতিফলন পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের মূল্যলাফের সম্ভাবনা কম, কারণ ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ।
প্রাইস ফিউচারস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিনের মতে, মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক সরকার তেলখাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য খুব একটা সহায়ক ছিল না। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত অবনতির কারণে দেশটির তেল শিল্প কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে হঠাৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও বিশ্ববাজারে বড় সংকটের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
চলতি বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাভাবের আশঙ্কা এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে তেলের দাম আগেই চাপের মধ্যে রয়েছে। ওপেক উৎপাদন বাড়ালেও চাহিদা সেই হারে বাড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের ওপরে উঠলেও দ্রুতই তা প্রায় ৫৭ ডলারে নেমে আসে।
রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার শূন্যতা নিয়ে। মাদুরোর অপসারণের পর যুক্তরাষ্ট্র নির্বাসিত নেতা এদমুন্দো গনজালেসকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও তাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
ফিল ফ্লিন মনে করেন, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেনাবাহিনী যদি বিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে বৈশ্বিক বাজার ইতিবাচক সংকেত পেতে পারে। তবে গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার ইঙ্গিত মিললে তেলবাজারে উল্টো চাপ তৈরি হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার তেলভান্ডার যত বড়ই হোক, উৎপাদন সক্ষমতা বাস্তবে অনেক কম। ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার আগে দেশটি দিনে দুই মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগ সংকট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
এ ছাড়া দেশটির তেল মূলত ভারী ও সালফারযুক্ত হওয়ায় উত্তোলন ও পরিশোধনে বিশেষ প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সে সক্ষমতা থাকলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতায় তারা দীর্ঘদিন ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম চালাতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বহু রিফাইনারি ভেনেজুয়েলার ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে তৈরি। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ভেনেজুয়েলার তেল শুধু দেশটির ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক তেলবাজারের গতিপথই বদলে দিতে পারে।




