নিজেকে বৈশ্বিক শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ বন্ধের দাবিও করেছিলেন তিনি। তবে বাস্তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর মাত্র এক বছরের মধ্যেই তার নির্দেশে অন্তত সাতটি দেশে ভয়াবহ বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী যা তার প্রচারিত শান্তির বার্তার সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক।
স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে মোট ৬২২টি হামলা চালিয়েছে। এসব অভিযান বিদেশে নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে ভোটারদের দেওয়া ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সাতটি দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, যার মধ্যে ছয়টিই মুসলিমপ্রধান দেশ। এই তালিকায় রয়েছে ভেনেজুয়েলা, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন ও ইরাক।
ভেনেজুয়েলা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল
গত ২ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের হামলার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। গত কয়েক মাস ধরে মাদক পাচারবিরোধী অভিযানের অজুহাতে ভেনেজুয়েলার স্থল ও জলসীমায় হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে একটি ডকিং ফ্যাসিলিটিতে হামলার বিষয়টি ওয়াশিংটন স্বীকারও করেছে। এদিকে আগস্ট থেকে ক্যারিবীয় সাগরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র একে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলা সীমান্ত পেরিয়ে মাদক পাচার বড় কোনো উৎস নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলায় অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন এবং অনেক ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নাইজেরিয়া
২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে নাইজেরিয়ার সোকোতো রাজ্যে মার্কিন বাহিনীর হামলা দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি সামরিক অভিযান। ওয়াশিংটনের দাবি, আইএস সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করেই এই হামলা। যদিও নাইজেরিয়া সরকার জানিয়েছে, সহিংসতায় মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সোমালিয়া
সোমালিয়ায় আল-শাবাব ও আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে বিমান হামলা নতুন মাত্রা পেয়েছে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে। পর্যবেক্ষকদের মতে, চলতি বছর এখানে অন্তত ১১১টি হামলা চালানো হয়েছে, যা আগের কয়েক প্রশাসনের সম্মিলিত সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের অভিযোগও উঠেছে।
সিরিয়া
১৯ ডিসেম্বর সিরিয়ায় আইএসআইএল-এর ৭০টি অবস্থানে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পালমিরায় বন্দুকযুদ্ধে দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে এই অভিযান পরিচালিত হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন হকআই’।
ইরান
১৩ জুন শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের শেষ দিনে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। ২২ জুন ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত।
ইয়েমেন
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথি হামলার জেরে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান আরও জোরালো হয়। ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর আওতায় বন্দর, বিমানবন্দর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০০ হুথি যোদ্ধা নিহতের দাবি করলেও ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক।
ইরাক
১৩ মার্চ ইরাকের আল-আনবার প্রদেশে আইএসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে চালানো হামলায় সংগঠনটির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবু খাদিজা নিহত হন। এই অভিযানের পর ট্রাম্প মন্তব্য করেন, “শক্তির মাধ্যমেই শান্তি আসে।”
সব মিলিয়ে, শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ও নোবেল শান্তি পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হয়েছে নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে—যা বিশ্ব রাজনীতিতে তার অবস্থানকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।




