ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিলো যে সব কাজের ধরণ

২০২৫ সাল প্রযুক্তির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বছরজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। গবেষণা সংস্থা ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এ বছর এআই শুধু ডিজিটাল টুলে সীমাবদ্ধ না থেকে কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইন এবং সৃজনশীল শিল্পে বাস্তব পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের বিপ্লব
২০২৫ সালে এআইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে ‘এআই এজেন্ট’-এর মাধ্যমে। আগের চ্যাটবটগুলো যেখানে কেবল প্রশ্নোত্তরে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে নতুন এআই এজেন্টগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-মেইল পাঠানো, মিটিং নির্ধারণ এবং জটিল প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ নিজে থেকেই সম্পন্ন করছে।

ম্যাকিনসে-এর এক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের অন্তত একটি ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহার করছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে এই হার আরও বেশি—৫০০০-এর বেশি কর্মী রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের ৭১ থেকে ৭৮ শতাংশ প্রশাসনিক কাজে জেনারেটিভ এআই যুক্ত করেছে।

স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের নতুন দিগন্ত
চিকিৎসা খাতে ২০২৫ সালে এআইয়ের ব্যবহার নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীনের গ্রামীণ অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকট মোকাবিলায় তরুণদের প্রায় অর্ধেকই এখন এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার ঝুঁকি উঠে এসেছে, তবুও অনেকের কাছে এআইয়ের সহানুভূতিশীল কথাবার্তাই বড় ভরসা।

প্রবীণদের যত্নেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিঙ্গাপুরে ‘ডেক্সি’ নামের একটি মানবসদৃশ রোবট ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণদের সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম করাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় একাকী বসবাসকারী প্রবীণদের দেওয়া হচ্ছে এআই সঙ্গী রোবট, যাদের তারা পরিবারের সদস্যের মতো গ্রহণ করছেন।

স্বাস্থ্যকর্মীরাও এআইয়ের সুফল পাচ্ছেন। ব্রাজিলের প্রত্যন্ত এলাকায় এক ফার্মাসিস্ট এআইয়ের সহায়তায় আগের তুলনায় চারগুণ দ্রুত প্রেসক্রিপশন যাচাই করে মারাত্মক ভুল শনাক্ত করতে পারছেন।

সৃজনশীল কনটেন্টে মাল্টিমোডাল এআই
২০২৫ সালে কনটেন্ট তৈরির ধরণ আমূল বদলে গেছে। জেনারেটিভ এআই এখন টেক্সট বা ছবি ছাড়িয়ে ভিডিও ও সংগীত তৈরিতেও দক্ষতা দেখাচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রিতে চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি ও রানওয়ের মতো এআই টুল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নির্মাতাদের মতে, এতে উৎপাদন খরচ কমে আসছে এবং আন্তর্জাতিক মানের কাজ করাও সহজ হচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি প্রতিরোধ
ডিজিটাল অপরাধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এআই হয়ে উঠেছে সুরক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রিয়েল-টাইমে জালিয়াতি শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করছে।

মাস্টারকার্ড জানিয়েছে, তাদের জেনারেটিভ এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ‘ডিজিশন ইন্টেলিজেন্স প্রো’ বৈধ লেনদেনকে ভুলভাবে জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করার হার প্রায় ৮৫ শতাংশ কমিয়েছে, ফলে আর্থিক নিরাপত্তা অনেক বেশি নির্ভুল হয়েছে।

শিক্ষা ও ব্যক্তিগত সহকারীতে এআই
২০২৫ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে ‘অ্যাডাপ্টিভ লার্নিং’ পদ্ধতিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করছে এআই-চালিত প্ল্যাটফর্ম।

কেনিয়ায় শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় অনেক বিদ্যালয় চ্যাটবটের সহায়তা নিচ্ছে। নাইরোবির এক শিক্ষক জানান, ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ পরিকল্পনায় এআই তার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে।

আইনি ব্যবস্থায় গতি ও দক্ষতা
ব্রাজিলে ঝুলে থাকা মামলার চাপ কমাতে বিচারব্যবস্থায় চালু হয়েছে ১৪০টির বেশি এআই প্রকল্প। এর ফলে বিচারকরা দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারছেন। আইনি নথি তৈরির সময় যেখানে আগে ২০ মিনিট লাগত, এখন তা কয়েক সেকেন্ডেই সম্ভব হচ্ছে।

বহুমুখী ব্যবহারে এআই
ভাষাগত বৈষম্য কমাতে মঙ্গোলিয়ায় স্থানীয় ভাষাভিত্তিক এআই মডেল তৈরি করছে ‘এগুনে এআই’, যা ব্যাংক, টেলিকম ও সরকারি দপ্তরে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আফ্রিকার মালাউইয়ে কৃষকেরা নিজেদের ভাষায় এআই চ্যাটবট থেকে পাচ্ছেন তাৎক্ষণিক কৃষি পরামর্শ। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সফল হচ্ছেন অনেক কৃষক।

চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের ইঙ্গিত
তবে এআইয়ের অগ্রগতির পাশাপাশি ডিপফেক, ভুয়া তথ্য ও কর্মসংস্থানে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ কঠোর এআই আইন কার্যকর করেছে।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে—এআই আর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, বরং বর্তমান সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানবজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব বাড়ছে, যা আগামী বছরগুলোতে আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন