বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশজুড়ে চলছে শোক ও সমবেদনার আবহ। এই প্রেক্ষাপটে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে দেওয়া ওই ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে পুরো জাতি আজ বেদনাহত ও নিস্তব্ধ। তিনি এই ক্ষতিকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য এক বড় শূন্যতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, শোকের এই কঠিন মুহূর্তে বিভেদ নয়, বরং সংযম, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, অবদান এবং দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন। তিনি মরহুমার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
জাতির প্রতি দেওয়া এই ভাষণে সরকারপ্রধান স্পষ্ট করে বলেন, এমন সংকটময় সময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, যা সবাইকে সম্মিলিতভাবে পালন করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
প্রিয় দেশবাসী,
আসসালামু আলাইকুম।
আজ আমাদের পুরো জাতি গভীর শোক ও বেদনায় নিস্তব্ধ। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির শীর্ষ নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তাঁর মৃত্যুতে জাতি এক মহান অভিভাবককে হারিয়েছে।
এই গভীর শোকের মুহুর্তে আমি তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং অগণিত কর্মী-সমর্থকের প্রতি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
মহান আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের সবাইকে এই গভীর শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি দান করেন।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পরম মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব। গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অসামান্য ভূমিকা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব বারবার জাতিকে গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে এবং মুক্তির প্রেরণা যুগিয়েছে।
দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর সমুজ্জ্বল অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, গণমুখী নেতৃত্ব এবং প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে তাঁর অবিচল ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এমন একজন মহান, দূরদর্শী ও নিখাদ দেশপ্রেমিক নেত্রীর শূন্যতা পূরণ হবার নয়।
প্রিয় দেশবাসী,
এই শোকাবহ মুহূর্তে আপনাদের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান—আসুন আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে মহান আল্লাহর দরবারে বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
একই সঙ্গে জাতির এই কঠিন সময়ে আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ থাকি। শোকের এই সময়ে কেউ যেন অস্থিতিশীলতা বা নাশকতার অপচেষ্টা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে আমি সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। এই সময়ে আমাদের সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রিয় দেশবাসী,
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমি তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং আগামীকাল তাঁর নামাজে জানাযার দিনে একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছি।
নামাজে জানাযাসহ সব ধরনের শোক পালনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আমি সবার প্রতি বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রিয় দেশবাসী,
আমি জানি, আপনারা সবাই এই সময়ে অনেক আবেগাপ্লুত। আমি আশা করছি, শোকের এই সময়ে আপনারা ধৈর্যের পরিচয় দেবেন এবং তাঁর জানাযাসহ সকল আনুষ্ঠানিকতা পালনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করবেন।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে ধৈর্য, শক্তি ও ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষমতা দিন।
আল্লাহ হাফেজ।




