ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উচ্চশিক্ষায় বড় সংস্কার: ইউজিসি বদলে হবে উচ্চশিক্ষা কমিশন

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরিবর্তে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। এই খসড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত আহ্বান করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ চূড়ান্ত হলে ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘দ্য ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন অব বাংলাদেশ অর্ডার’ বাতিল হয়ে যাবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানসহ মোট ৯ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে উচ্চশিক্ষা কমিশন। একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।

খসড়া অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের মর্যাদা হবে মন্ত্রীর সমান এবং কমিশনারদের পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমপর্যায়ের। এতে ইউজিসির তুলনায় নতুন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, কমিশনের দেওয়া কোনো সুপারিশ বা নির্দেশ যুক্তিসংগত সময়ে বাস্তবায়ন না হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ অর্থ স্থগিত করার ক্ষমতা থাকবে উচ্চশিক্ষা কমিশনের হাতে। পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে কোনো প্রোগ্রাম বা কোর্স বাতিল, স্থগিত কিংবা শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করার নির্দেশও দিতে পারবে কমিশন।

তবে অধ্যাদেশের খসড়া অপরিবর্তিতভাবে অনুমোদন পাবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন একাধিক শিক্ষাবিদ। ইউজিসির সাবেক এক চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের উচ্চ পদমর্যাদা এবং ব্যাপক ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে আপত্তি আসতে পারে।

ইউজিসির বর্তমান সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ইউজিসি এখন নিজস্বভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নই তাদের মূল দায়িত্ব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন কমিশন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাবে। তবে পারস্পরিক সম্মান ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হবে কিনা সে বিষয়ে বিষয়ে তার সংশয় থাকলেও তিনি আশাবাদী থাকতে চান।

খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিন সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হবে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য। এই কমিটির প্রধান হবেন সাবেক প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। অন্য দুই সদস্য হবেন ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও একজন জাতীয় অধ্যাপক। সার্চ কমিটি প্রতিটি পদের জন্য অন্তত দুইজনের নাম সুপারিশ করবে এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।

বর্তমানে ইউজিসিতে চেয়ারম্যানসহ সর্বোচ্চ পাঁচজন পূর্ণকালীন সদস্য ও নয়জন খণ্ডকালীন সদস্য রয়েছেন। নতুন কমিশনে পূর্ণকালীন কমিশনারদের পাশাপাশি ১০ জন খণ্ডকালীন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অধ্যাদেশের খসড়া অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের যেসব কারণ ও প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা যায়, সেই একই নিয়ম ছাড়া উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অপসারণ করা যাবে না। গুরুতর অসদাচরণ বা দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা প্রমাণিত হলেই কেবল রাষ্ট্রপতি তাদের অপসারণ করতে পারবেন।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতি তিন বছর পরপর দেশের সব অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং প্রকাশ করবে। নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই র‌্যাংকিং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে এবং মানের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ তদারকির আওতায় আনা হবে।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ, অনুষদ বা প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে উচ্চশিক্ষা কমিশন। এছাড়া সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য অভিন্ন নীতিমালা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত নীতিও প্রণয়ন করবে কমিশন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিজ আলিফ রুদাবা জানান, খসড়া অধ্যাদেশের ওপর ৩০ কার্যদিবস মতামত নেওয়া হবে। অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় ও কর্মশালার পর আইনি যাচাই শেষে এটি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তোলা হবে। সংসদ না থাকায় আপাতত অধ্যাদেশ আকারে প্রণয়ন হলেও সংসদ গঠনের পর এটি আইনে রূপ পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন