ঢাকা | শনিবার
৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিশ্বের নজরে মিয়ানমারের বিতর্কিত নির্বাচন

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর টানা গৃহযুদ্ধের মধ্যে এবার সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে মিয়ানমারের জান্তা সরকাররোববার (২৮ ডিসেম্বর) শুরু হতে যাওয়া তিন ধাপের এই নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে মিন অং হ্লাইং প্রশাসনআন্তর্জাতিক মহলের মতে, জান্তা সরকারের অধীনে এটি আরেকটি পাতানো নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

মিয়ানমারের মোট ৩৩০টি প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে তিন ধাপে ২৬৫টি অঞ্চলে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে জান্তা সরকার। তবে ভোটের আয়োজনের পাশাপাশি সামরিক অভিযান জোরদারের ঘোষণায় নির্বাচন আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। জান্তাবিরোধী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতেও স্থল ও নৌপথে অভিযান বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী।

এই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া অনেক তরুণ জান্তা সরকারের এই নির্বাচনকে ‘কমেডি শো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটের মাধ্যমে জান্তা সরকার কেবল নিজেদের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই জান্তা সরকার এই সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করছে। এরই মধ্যে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সামরিক বাহিনীর একটি ঘাঁটি থেকে জনগণকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সতর্ক করে বলেছেন, এমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে যারা তাতমাদো বা মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে গৃহযুদ্ধের ময়দানে যা অর্জন করতে পারেনি, জান্তা সরকার তা নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জন করতে চায়নিজেদের সমর্থিত দলকে জয়ী করে ক্ষমতা আরও সুসংহত করাপাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদ্যমান চাপঅসন্তোষ কিছুটা কমানোর চেষ্টাও রয়েছে।

তবে কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, গৃহযুদ্ধ আরও তীব্র হওয়া এই দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা আনা প্রায় অসম্ভব। যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুরু থেকেই এই নির্বাচন নিয়ে সন্দিহান, সেখানে নির্বাচনের পর বৈদেশিক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনাও কম।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ভোটের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হবে ২৮ ডিসেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১১ জানুয়ারি এবং তৃতীয় ও শেষ ধাপ আগামী বছরের ২৫ জানুয়ারি। তিন ধাপে মোট ২০২টি এলাকায় ভোটগ্রহণ হবে। তৃতীয় ধাপে ৬৩টি টাউনশিপে ভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার। মিন অং হ্লাইং নিজেও স্বীকার করেছেন, সারা দেশে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই মিয়ানমারে বেশির ভাগ সময় সামরিক বাহিনীর শাসন চলছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করেন মিন অং হ্লাইং। সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ী হলেও দলটিকে ভেঙে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এবারের নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারছে না।

জান্তাবিরোধী অন্যান্য দল ও প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মাত্র ছয়টি দল, যার মধ্যে সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষক ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক বাহিনীর আয়োজন করা এই নির্বাচনের ফলে দেশে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হবে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকরাও এই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। যদিও জান্তা সরকারের দাবি, এই নির্বাচন জনগণের সমর্থন পাচ্ছে এবং এটি বেসামরিক শাসনে ফেরার পথ তৈরি করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন