ইয়েমেনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে। একদিকে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বন্দি বিনিময় চুক্তি, অন্যদিকে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা এই দুই বিপরীত বার্তা ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
জাতিসংঘের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি বড় বন্দি বিনিময় চুক্তি হয়েছে। জাতিসংঘের ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুডবার্গ জানান, ওমানের রাজধানী মাসকাটে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনার পর এই সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
হুতি প্রতিনিধি দলের কর্মকর্তা আবদুলকাদের আল-মোর্তাজা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, এই চুক্তির আওতায় উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের মতো বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। ইয়েমেনের জন্য এই উদ্যোগকে অনেকেই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
তবে এই আশাবাদের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদন। গত ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) খুব শিগগিরই দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসটিসির হাতে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার সেনা এবং তারা ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এসব অঞ্চলে রয়েছে দেশের উল্লেখযোগ্য তেল ও খনিজ সম্পদ। এসটিসির লক্ষ্য সৌদি আরব ও ওমান সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ ইয়েমেনকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এই সম্ভাব্য বিভাজন শুধু ইয়েমেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকি নয়, বরং সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রভাবের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। উল্লেখ্য, হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে প্রবাসী সরকার হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ইয়েমেন যদি আবার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তবে রিয়াদ-সমর্থিত সরকারের বৈধতা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়বে, তেমনি ইয়েমেনে সৌদি আধিপত্যও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। হুতি বিদ্রোহীদের ইরান-সমর্থিত শিয়া গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়, বিপরীতে সৌদি আরব সুন্নি গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষক বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাম।
ভৌগোলিকভাবে ইয়েমেন লোহিত সাগরের মুখে অবস্থিত, যা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ ব্যবহার করে পরিবাহিত হয়। ফলে ইয়েমেনের ওপর যে শক্তির প্রভাব থাকবে, তার হাতে থাকবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে ইয়েমেনে সোনা, রুপা, গ্রানাইটসহ নানা মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল সম্ভাবনার কথা। এসব সম্পদের বিনিময়ে খাদ্য বা সামরিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ইতিহাস বলছে, ইয়েমেন আগে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই অংশে বিভক্ত ছিল। ১৯৯০ সালে একত্রিত হলেও সেই ঐক্য টেকসই হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও সেই পুরোনো বিভাজনের ছায়া স্পষ্ট হচ্ছে।
জাতিসংঘ ও পশ্চিমা কূটনীতিকরা ইয়েমেন বিভক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে সব পক্ষের অংশগ্রহণে রাজনৈতিক সমাধান চান। তবে দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিদ্ধান্তের ওপর।
বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে শান্তির ক্ষীণ আলো দেখা গেলেও, ইয়েমেনের সামনে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে এই দেশ কি ঐক্যের পথে ফিরবে, নাকি আবারও ইতিহাসের পাতায় নতুন বিভাজনের অধ্যায় যুক্ত হবে?




