বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগোলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং একই দিনে গণভোটও হবে। ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোটগ্রহণ চলবে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচন কমিশন (ইসি) শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) পরিপত্র জারি করেছে। ইসি সচিবালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রে মনোনয়নপত্র দাখিল ও গ্রহণ, জামানত, প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীর যোগ্যতা, রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনয়ন, মনোনয়ন বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশসহ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় ৫০ হাজার টাকা জামানত দিতে হবে। এই জামানত নগদ অর্থ, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের অনুকূলে জমা দেওয়া যাবে। কোনো প্রার্থী সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় প্রদত্ত মোট ভোটের এক-অষ্টমাংশ ভোট পেতে ব্যর্থ হলে তার জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত হবে। একই এলাকায় একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল করলে একটি জামানতই যথেষ্ট হবে, তবে অন্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে চালানের সত্যায়িত অনুলিপি সংযুক্ত করতে হবে।
ইসি স্পষ্ট করেছে, জামানতের বাইরে কোনো অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ বা প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জামানতের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক, যেকোনো তফসিলি ব্যাংক বা সরকারি ট্রেজারি ও সাব-ট্রেজারিতে নির্ধারিত কোড নম্বরে জমা দিতে হবে। নগদে প্রাপ্ত জামানতের টাকা রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে, তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীরা রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। ইতোমধ্যে এসব ফরম জেলা ও সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ফরম বিতরণের জন্য পৃথক রেজিস্টার সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারবেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে যেকোনো কর্মদিবসে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ইসির সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন।
মনোনয়নপত্র জমা নেওয়ার সময় রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নির্দিষ্ট নিয়মে ক্রমিক নম্বর প্রদান করবেন এবং প্রতিটি মনোনয়নপত্রের তথ্য রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করবেন। একই সঙ্গে প্রার্থী বা তার প্রস্তাবকারী কিংবা সমর্থনকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্তিস্বীকার রসিদ প্রদান করতে হবে, যেখানে বাছাইয়ের তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ থাকবে।
যেহেতু মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের চূড়ান্ত ক্ষমতা রিটার্নিং অফিসারের হাতে, তাই সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া সব মনোনয়নপত্র ২৯ ডিসেম্বর বিকেল ৫টার পর নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাতে হবে।
প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীর ক্ষেত্রে ইসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার যেকোনো ভোটার যোগ্য প্রার্থীকে প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারবেন। তবে একজন ভোটার একাধিক মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারী বা সমর্থনকারী হিসেবে স্বাক্ষর করতে পারবেন না। প্রতিটি মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর সম্মতি, অযোগ্যতা না থাকার ঘোষণা এবং তিনটির বেশি নির্বাচনি এলাকায় মনোনয়ন না দেওয়ার অঙ্গীকার থাকতে হবে।
রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা সমমানের পদাধিকারীর স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র দলের প্যাডে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো নির্বাচনি এলাকায় দল একাধিক প্রার্থী দিলে আগামী ২০ জানুয়ারি বিকেল ৫টার মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম লিখিতভাবে রিটার্নিং অফিসারকে জানাতে হবে।
সবশেষে ইসি জানিয়েছে, চূড়ান্তভাবে মনোনীত প্রার্থীরাই দলীয় প্রতীক পাবেন, যদি তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন। প্রতীক বরাদ্দের বিস্তারিত নিয়ম পরে পৃথক পরিপত্রে জানানো হবে। এই নির্দেশনাগুলোর মধ্য দিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা ও প্রতিযোগিতার মাঠ প্রস্তুত করছে নির্বাচন কমিশন।




