ঢাকা | শনিবার
৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মামলায় অচল চার লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা দ্রুত ফুলে-ফেঁপে উঠছে। ব্যাংকগুলো ঋণ উদ্ধারে প্রচুর মামলা করলেও তার সুফল মিলছে খুব কম। বছরের জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে চলমান মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২২ হাজার ৩৪১টি, যেখানে আটকে আছে চার লাখ সাত হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত মামলার সংখ্যা ছিল দুই লাখ ১৯ হাজার ৬৩৩টি এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ তিন লাখ ২০ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বিভাগের একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।

রোববার (০৭ ডিসেম্বর) ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর খেলাপি ঋণ সম্পর্কিত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে ব্যাংকগুলোকে কার্যকর নির্দেশনা দেন। তাঁর মতে, মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো ছাড়া চলমান ঋণ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, মামলা নিষ্পত্তির গতি কমে যাওয়া এবং নতুন মামলা দায়েরের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আদালতে মামলার স্তূপ কমছে না। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ৯৪৪টি মামলা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৯১০ কোটি টাকা। একই সময়ে নতুন করে দায়ের করা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৫২টি মামলা, যার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়।

চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৪টি এবং আদায়কৃত অর্থ ছিল এক হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মার্চ থেকে জুন প্রান্তিকে নিষ্পত্তি বেড়েছে এক হাজার ৮৮০টি মামলা এবং আদায় বেড়েছে এক হাজার ৭৬ কোটি টাকা। তবে মোট বকেয়ার তুলনায় এই অগ্রগতি খুবই নগণ্য।

ব্যাংকিং সূত্র বলছে, নানা ধরনের আর্থিক অনিয়ম, জালিয়াতি ও সুবিধা গ্রহণের পর খেলাপিরা ঋণ ফেরত দিতে আগ্রহী নন। আইনি বাধ্যবাধকতায় অর্থঋণ আদালতে মামলা হলেও তা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ব্যাংকগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, ঋণগ্রহীতার টালবাহানা এবং আদালতের ধীরগতি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ব্যাংকারদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা খুব কম; পর্যাপ্ত বিচারক নেই; পাশাপাশি ব্যাংকের আইনজীবীদের মামলার কাগজপত্র সরবরাহেও দেরি হয়। এসব কারণে মামলা নিষ্পত্তি দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়, ফলে ঋণ উদ্ধারের বাস্তব অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রতিবেদনটি বলছে, ব্যাংকগুলো এ অবস্থায় বিশাল আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ছে এবং সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে। বিশাল পরিমাণ অর্থ মামলায় আটকে থাকায় ব্যাংকের মূলধন কাঠামো দুর্বল হচ্ছে, যা স্বাভাবিক ঋণচক্রকে বাধাগ্রস্ত করছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর লিগ্যাল টিম শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছে। নতুন নির্দেশনায় আইন বিভাগে কর্মকর্তা ও প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ এবং তাদের বার্ষিক মূল্যায়নের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, মামলাধীন বিপুল খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দক্ষ লিগ্যাল টিম গঠন এখন জরুরি।

অনেক ঋণগ্রহীতা হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগে রিট করে মামলার অগ্রগতি থামিয়ে রাখছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। শক্তিশালী আইন বিভাগ গড়ে তোলা গেলে এসব মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত হবে, ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতি উন্নত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার।

সংবাদটি শেয়ার করুন