পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার বলেছেন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে ত্রিদেশীয় জোট গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে অন্যান্য দেশকেও যুক্ত করে জোটের পরিধি সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তিনি জানিয়েছেন, এই জোট কেবল এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, প্রয়োজন হলে অন্যান্য অঞ্চলের দেশও এতে অংশ নিতে পারবে।
গত বুধবার (৩ ডিসেম্বর) ইসলামাবাদ কনক্লেভ ফোরামে ইশহাক দার বলেন, “আমরা নিজেরা লাভবান হতে চাই, অন্যকে ক্ষতি করা নয়। সবসময় সংঘাতের বদলে সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।” তিনি সার্কের বিকল্প কোনো আঞ্চলিক মেকানিজম স্থাপনের কথা তুলে ধরেছেন, যেহেতু ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনার কারণে সার্ক কার্যত অকার্যকর।
২০২৫ সালের জুনে চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কূটনীতিকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয় আলোচনা করা হয়েছিল। তৎসময়ে বলা হয়েছিল, এই আলোচনার লক্ষ্য তৃতীয় কোনো দেশ নয়।
ইশহাক দার বলেন, “আমাদের জাতীয় উন্নয়ন ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকার কারও চাপের নিচে থাকা উচিত নয়। আমরা এমন একটি দক্ষিণ এশিয়া চাই যেখানে বিভাজনের জায়গায় সম্পর্ক ও সহযোগিতা থাকবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে এবং দ্বন্দ্বগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যাবে।”
সার্কের প্রেক্ষাপট
সার্ক (SAARC) ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রাথমিক সদস্য দেশগুলো ছিল বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। ২০০৭ সালে আফগানিস্তান অষ্টম সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। সার্কের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ। তবে ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘকালীন বৈরিতার কারণে ৪০ বছরেরও বেশি সময়েও এই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
২০১৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সার্কের ১৯তম সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাশ্মিরে হামলার পর ভারত সম্মেলনে না যাওয়ায় সার্ক কার্যত স্থবির হয়ে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা ২০০ কোটির বেশি হলেও, এই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য মাত্র ৫ শতাংশ (২৩ বিলিয়ন ডলার) হয়। তুলনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১ দেশের আসিয়ান জোটের মধ্যে বাণিজ্যের হার ২৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, আঞ্চলিক বাধা দূর হলে দক্ষিণ এশিয়া ৬৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করতে পারবে।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য ২০২৪ সালে মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার হলেও, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে তাদের বাণিজ্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো হয়েছে।
নতুন জোটের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের এ প্রস্তাব উচ্চাকাঙ্খী হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রাবেয়া আক্তার বলেন, “এ ধরনের উদ্যোগে অংশগ্রহণ ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।”
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রবীণ দোন্থি বলেন, “নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের সুযোগ তাত্ত্বিকভাবে আছে। সার্কের স্থবির অবস্থা এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের খারাপ অবস্থার কারণে পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় জোটের পথ তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, পাকিস্তানের এ প্রস্তাব সফল হলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে এবং ভারত-চীনের প্রতিযোগিতাও বাড়বে।




