ঢাকা | মঙ্গলবার
৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
২০শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ছয় ভূমিকম্পে আতঙ্কে দেশ, জাপান থেকে কি শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশে একের পর এক ভূমিকম্পের কম্পন সাধারণ মানুষের মনে যে আতঙ্ক তৈরি করেছে, তা শুধু ভূ-পৃষ্ঠের অস্থিরতার কারণে নয় বরং প্রস্তুতির ঘাটতিই এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গত এক সপ্তাহে ছয় দফা কম্পন দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক ঝুঁকি কতটা ঘনঘন সামনে আসতে পারে; কিন্তু একই সময়ে প্রশ্ন উঠেছে জাপানের মতো নিয়মিত ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ যখন সুবিন্যস্ত প্রস্তুতি ও প্রযুক্তির সহায়তায় স্বাভাবিক জীবন বজায় রাখে, তখন বাংলাদেশ এখনো কেন অপ্রস্তুত? ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও, সচেতনতা, অবকাঠামো এবং নীতিগত প্রস্তুতিতে যে ব্যবধান রয়েছে সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সম্প্রতি ২১ নভেম্বর সকালবেলার ভূমিকম্পের পর এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছয়বার কম্পন অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমেনি, বরং আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে। ফলে ভূমিকম্প-সংক্রান্ত নানা তথ্য জানতে আগ্রহ বেড়েছে সবার মধ্যে।

তবে বাংলাদেশের খুব দূরে নয়—পূর্ব দিকে অবস্থান করা প্রতিবেশী দেশ জাপানে ভূমিকম্প যেন নিত্যদিনের ঘটনা। বছরে প্রায় দেড় হাজার কম্পন হয় সেখানে, আর সুনামির সতর্কতাও মিলতে থাকে নিয়মিত। তাহলে কীভাবে এই ভৌতঝুঁকির মাঝেও দেশটি স্বাভাবিক জীবন বজায় রাখে? আকাশচুম্বী ভবনের দেশ জাপান ভূমিকম্প সহনশীল ভবন তৈরিতে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে? আর টানা কয়েকটি কম্পনে কেঁপে ওঠা বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে কী শিখতে পারে সেই প্রশ্ন এখন বিশেষ আলোচনায়।

জাপানের এত ভূমিকম্প হওয়ার কারণ ভূতাত্ত্বিক। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত, যেখানে ইউরেশিয়ান, ফিলিপাইন ও প্যাসিফিক—তিনটি টেকটোনিক প্লেট মিলিত হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলগুলোর একটি হওয়ায় ছোট-বড় অসংখ্য কম্পন নিয়মিত ঘটেই থাকে। এর অনেক কম্পনই মানুষ টের পায় না, তবে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প দেশটিতে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। যদিও বড় ভূমিকম্পও জাপান বহুবার মোকাবিলা করেছে।

বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছর বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রস্তুতি নিয়ে থাকে, কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সেই মানসিকতা বা প্রস্তুতি অনেকটাই অনুপস্থিত—মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষের কাছে ভূমিকম্প মানে কেবল ঝাঁকুনি; এর বাইরে প্রস্তুতি বা করণীয় সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ূন আখতার বলেন, ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে যে আতঙ্ক দেখা গেছে, জাপানের মানুষ সাধারণত তা অনুভব করেন না। এর মূল কারণ নিয়মিত সচেতনতা ও প্রস্তুতি।

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব জানান, জাপানে শিশুদের জন্মের পর থেকেই ভূমিকম্প মোকাবিলার শিক্ষা দেওয়া হয়। স্কুলে নিয়মিত ড্রিল হয়—ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া, নিরাপদ স্থানে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে শিশুরা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সাধারণত প্রতি ১৫ দিন পরপর এসব অনুশীলন হয়।

বাংলাদেশেও এসব মহড়া বিশেষ ব্যয় ছাড়াই করা সম্ভব, এবং তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়—মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জাপানে কোথায় নিকটতম নিরাপদ আশ্রয় বা খোলা মাঠ আছে, সেটি সবাই জানে। কিন্তু ঢাকায় বা অন্যান্য বড় শহরে এ রকম নিরাপদ জায়গা নির্ধারণ ও প্রচারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন ইকবাল হাবিব। অবকাঠামোগত নিরাপত্তাও জাপানে অত্যন্ত কার্যকর। বড় ভবনগুলো এমনভাবে নকশা করা হয় যে ভূমিকম্পে ভেঙে না পড়ে, বরং দুলতে থাকে—এতে ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশের বড় ভবনের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মানা হলেও, ছোট ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনগুলোতে সে মানদণ্ড মানা হয় না, যা বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

জাপানের ভবনের স্থিতিস্থাপকতার রহস্য

সারা বছর অসংখ্য ভূমিকম্পের মধ্যেও জাপানের আকাশচুম্বী ভবনগুলোর টিকে থাকার রহস্য মূলত স্থিতিস্থাপকতা। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ড. জুন সাতো জানান, ছোট ভবন থেকে আকাশচুম্বী সব ভবনকেই ভূমিকম্প-সহনশীল করা বাধ্যতামূলক।

প্রকৌশলীরা ভবনের নকশায় দুই ধরনের ভূমিকম্পের কথা মাথায় রাখেন—স্বল্পমাত্রার কম্পনে যেন কোনো ক্ষতি না হয় এবং ভয়াবহ কম্পনেও যেন ভবন ধসে না পড়ে, মানুষের জীবন যেন রক্ষা পায়।

এর জন্য ব্যবহৃত হয় সিসমিক আইসোলেশন প্রযুক্তি, অর্থাৎ ভবনের নিচে রাবারের পুরু প্যাড বা বিয়ারিং বসানো হয়, যা ভবনকে ‘নেচে ওঠার’ মতো ক্ষমতা দেয়। পাশাপাশি মোশন ড্যাম্পার, মেশ স্ট্রাকচারসহ নানা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে ভবনের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় যদিও এসব উন্নত প্রযুক্তি সব ভবনে প্রয়োগ করা কঠিন, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত মহড়া এবং বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেই বড় বিপর্যয় অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। রাজনৈতিক সদিচ্ছাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন