একটা শৈশবের ঘটনা দিয়ে শুরু করি। ২০০৭ সাল। ১/১১ সরকারের যাত্রা শুরু মাত্র। সারা দেশে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন শুরু। জোরদার হচ্ছে টহল। আমার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়াও বাদ যায়নি এই অভিযান থেকে। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় দ্বীপটি ছিল নৌবাহিনীর আওতায়। সেই সময় নৌবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের আগেই দ্বীপের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে অনেক সরকারি কর্মকর্তা পর্যন্ত পালিয়ে ছিলেন পাশের চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বন-জঙ্গলে। বহু চোর-ডাকাত দাঁড়ি-টুপি পরে তাবলিগ জামায়াতে পর্যন্ত নাম লেখান যৌথবাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে। এদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই ছিল চুরি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ। ফলে সেই সময়ে অপরাধের মাত্রা নেমে এসেছিল এক অঙ্কে।
অন্যদিকে, ২০২৪। ঘটেছিল এক অন্যায়, জুলুম, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারী বর্বর সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ। সারা দেশে বৈষম্যের শিকার হাজার-হাজার ছাত্র-জনতার বলিষ্ঠ প্রতিরোধের মুখে পালাতে বাধ্য হয় এক মহাপরাক্রমশালী দানবীয় সরকার প্রধানকে। কিন্তু এরই মধ্যে তান্ডব চালাতে মরিয়া হয়ে ওঠে মব সৃষ্টিকারী একদল হায়েনা। যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে আমি মনে করি না। তবে পরিচয়টা সুকৌশলে গ্রহণ করে ফায়দা লুটতে চায় তারা। এর পেছনে দেশি-বিদেশি শক্তিশালী পক্ষের মহাদানবীয় হাত রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। যা এখনো অনেকেই বুঝতে পারছে না। এ কথা সত্য, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে। সাধারণ মানুষ যেমন তাদের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারছিল না, তেমনি পুলিশও জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। সেই সুযোগে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে অপরাধীরা। যার প্রেক্ষিতে দেশে যৌথবাহিনী মোতায়েন করে সরকার। তাদের দেওয়া হয় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও। কিন্তু যৌথবাহিনী রাস্তায় থাকার পরও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। সারা দেশে মব জাস্টিসের শিকার হন বহু মানুষ। সেনাপ্রধানকেও বলতে শোনা যায়- মব জাস্টিস সহ্য করা হবে না। কিন্তু অপরাধীদের কর্মকান্ড এখনো এক অঙ্কে নামেনি।
যৌথবাহিনী মাঠে থাকার পরও কেন নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছেএই প্রশ্ন এখন শহর থেকে গ্রাাম পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মুখেমুখে। এর উত্তরে বেরিয়ে আসছেতাহলে কি কিছু ‘ঘটছে’? যদি না ঘটে, তাহলে এতসব মব সৃষ্টির পরও যৌথবাহিনী কঠোর হচ্ছে না কেন? সাধারণ নাগরিকদের আস্থার একমাত্র প্রতীক এই বাহিনী কি তাদের কাছে নতি স্বীকার করছে? নাকি কেউ চায় না দেশের মানুষ নিরাপত্তা পাক? নাকি তাদেও একমাত্র চাওয়া জুলাই পরবর্তী নাগরিকরা বলতে থাকুক ‘আগেই তো ভালো ছিলাম।’ ১/১১এর উদাহরণটি এই কারণে আনলাম সেই সময়ে যৌথবাহিনীর নাম শুনেই বহু জনপ্রতিনিধিকে বন-জঙ্গলে ঘুমাতে হয়েছিল। তাহলে সেই একই বাহিনী বর্তমানে মাঠে থাকার পরও কেন এত মব সৃষ্ট হচ্ছে? সন্ত্রাসীরা দিব্যি কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। দিবালোকে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করছে, তাও আবার রাজধানী ঢাকার বুকেই?
তবে এটাও সত্য দেশের আপামর জনসাধারণের আস্থা যার ওপর, সেই আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দলকে কলুষিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি ষড়যন্ত্রকারী শক্তি। এজন্য সুকৌশলে খুনিদের সুবিধাবাদী নেতাদের কাছে ভিড়িয়ে দিচ্ছে। যারা অর্থের বিনিময়ে পদ-পদবী নিচ্ছে এবং অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে দায় গিয়ে পড়ছে জনগণের দল ও আস্থা এবং ভরসার প্রতীক বিএনপির ওপর। এজন্য দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী শক্তি এখনো সক্রিয়, যারা বিনিয়োগ করছে তাদের পরম ‘আত্মীয়’ সাবেকস্বৈরাচারী সরকারকে ফিরিয়ে আনতে। তাদের উদ্দেশ্যবিএনপিকে জনগণের কাছথেকে বিচ্ছিন্ন করা।
তাই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এখনই তীক্ষ্ণদৃষ্টি ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। জনগণের আস্থা যদি একবার ভেঙে পড়ে, সেখানে জোড়া লাগানো কঠিন হবে।আর ভোগ করতে হবে ভয়াবহ পরিণতি। সর্বশেষ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে একজন মানুষকে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, বরং মানবিকতার চরম অবনমন। ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে ডেকে এনে যেভাবে ইট-পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, পিটিয়ে, এমনকি বিবস্ত্র করে শরীরের ওপর লাফিয়ে হত্যা করা হয়েছেতা সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। অথচ ঘটনার সময়ে ধারণ করা ভিডিও চিত্রটিতে শোনা যায়, ঘটনারস্থলের পাশেই পুলিশের ভ্যানগাড়ির সাইনের বাজছে। তার পরেও অপরাধীরা ভীত হয়নি। পালানোর চেষ্টাও করেনি। পুলিশও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে একের পর এক নৃশংস হত্যা, গণপিটুনি এবং প্রতিশোধের নামে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছেতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এসব ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সাম্প্রতি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, মব জাস্টিসের ঘটনা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে এবং এটি আমাদের সমাজে গভীর প্রভাব ফেলছে। গণপিটুনি, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বাড়ছে। এতে দুষ্কৃতিকারী ছাড়াও নিরপরাধ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মব তৈরি করছে। যার ফলে বাড়ছে হত্যা, ছিনতাই, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও।
সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ তুলে ধরা যাক। খুলনায় গুলি করে ও রগ কেটে সেই সাবেক যুবদল নেতাকে হত্যা: এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকান্ড ঘটে। নারায়ণগঞ্জে যুবককে গাছে বেঁধে পেটানো ও ভিডিও ধারণ: সামাজিকভাবে অপমান এবং প্রাণঘাতী হামলা। গাজীপুরে গার্মেন্টস কর্মী তরুণীকে এসিড নিক্ষেপ ও ছুরিকাঘাত: প্রেম প্রত্যাখ্যানের ‘শাস্তি’। কুষ্টিয়ায় জমি সংক্রান্ত বিরোধে পুরো পরিবারকে কুপিয়ে হত্যা: শিশুরাও রেহাই পায়নি। চট্টগ্রামে বাসা থেকে তুলে নিয়ে কিশোর হত্যা: সন্দেহভাজন বন্ধুরা খুনে জড়িত। এই ঘটনাগুলো কেবল পুলিশি রিপোর্ট নয়, আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
এটা এখন স্পষ্ট যে দেশে বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও পুলিশের ভূমিকা নিছক “দেখার” পর্যায়ে রয়ে গেছে। আইনের প্রতি জনগণের আস্থা হারিয়ে গেলে তারাই আইন হাতে তুলে নেয়। এখান থেকেই শুরু হয় গণপিটুনি, প্রতিশোধ, এবং ভিডিও ভাইরালের মাধ্যমে তথাকথিত ‘বিচার’।
কীভাবে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়?
- দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল: নৃশংস হত্যাকান্ডর জন্য বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক আদালত, যেখানে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে রায় হবে।
- স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থা: গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে উন্নত সিসিটিভি, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও ফেস রিকগনিশন চালু।
- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় রায় দিতে হবে।
- সামাজিক সচেতনতা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করাও জরুরি।
- গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার: অপরাধের ভিডিও ভাইরাল না করে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন ও আইনি সচেতনতা প্রচার করতে হবে।
- যৌথবাহিনীর তৎপরতা: দেশে মোতায়েন করা যৌথবাহীসহ পুলিশ বাহিনীকে আরও তৎপর ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধীতে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
- রাজনৈতিক পদক্ষেপ: রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদেও দুষ্কৃতকারীকর্মীদের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ অপরাধীদের মদদ দিলে সঙ্গে সেঙ্গ বহিস্কারসহ সাংগঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়: একটি সমাজ তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও নৃশংসতার প্রতি ঘৃণা থাকে। যদি দিনের আলোয় জনবহুল এলাকায় একজন মানুষ প্রাণ হারায় আর কেউ এগিয়ে না আসেতাহলে সভ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমরা যদি এখনই না জেগে উঠি বা না প্রতিরোধ গড়ে তুলিতবে এই নৃশংসতার আগুন আমাদের প্রতিটি ঘরের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছে যাবে।
শাহেদ শফিক
লেখক ও সাংবাদিক, লন্ডন, যুক্তরাজ্য।




