ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

লোহার খাঁচায় যমজ শিশুদের নিয়ে রাস্তায় অসহায় মা!

লোহার খাঁচার ভেতরে বসে আছে ১৩ মাস বয়সী তিন যমজ শিশু-আবদুল্লাহ, আমেনা ও আয়েশা। খাঁচার বাইরে, ক্লান্ত পায়ে হাঁটছে সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট মেয়ে মরিয়ম। আর তাদের সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় ছুটে চলেছেন এক অসহায় মা-জান্নাত বেগম।

ঠাকুরগাঁও সদরের রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা করছেন চার সন্তানের মা জান্নাত। কখনো দোকানের সামনে, কখনো কারও বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন সন্তানদের নিয়ে। চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া, মুখে চেপে রাখা হাজারো কষ্ট।

জান্নাত বেগম জানান, পাঁচ বছর আগে ঢাকায় তার বিয়ে হয় হাবিলের সঙ্গে। বিয়ের পর ঠাকুরগাঁও চলে আসেন স্বামীর সঙ্গে। তার বাবার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। শুরুর কিছুদিন সংসার ভালোই চলছিল। প্রথমে এক কন্যা সন্তানের পর যমজ ৩ সন্তানের মা হন জান্নাত বেগম। এরপরই তার জীবনে নেমে আসে দোযখ। সন্তান, স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যান হাবিল। 

এরপর থেকেই ৪ শিশুসন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়েন এই অসহায় মা। যেভাবেই হোক, সন্তানদের জন্য তিনি অনেক ভেবে বেঁচে থাকার একটা উপায় বের করেন। তিনি চলে যান কামারের দোকানে। তাদের বলে দুটি চাকা লাগানো একটি লোহার খাচা বানিয়ে নেন। সেই খাচার ভেতর ৩ শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে।   

তিনি বলেন, তিন পোলা-মাইয়া নিয়া তো আর হাঁটা যায় না। তাই গাড়ি বানাইছি। বিভিন্ন সময় অনেকেই সন্তানদের কিনে নিতে লাখ লাখ টাকার প্রস্তাব দিছে। আমি রাজি হই নাই।

সন্তানের প্রতি মায়ার কাছে হার মেনেছে টাকার লোভ। তারপরও জীবনযুদ্ধে হার মানেনি জান্নাত বেগম। তিনি বলেন, ‘‘আমি সাহায্য তুলে দিনযাপন করছি। যা আপমানের, লজ্জার। কিন্তু এ ছাড়া আমার তো কোনো উপায় নাই। বাসাবাড়িতে কাজের প্রস্তাব পাইছি। কিন্তু ছোটো ছোটো বাচ্চা, কার কাছে রেখে যাব?’’

৭ হাজার টাকা খরচ করে খাঁচাসহ গাড়ি বানিয়েছেন জান্নাত বেগম। সন্তানদের এই খাঁচায় নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাহায্য তোলেন। যদিও খুব বেশি সহযোগিতা তিনি পান না। ‘ঘুরে বেশি পরিমাণে টাকা পাই না। সন্তানদের পুষ্টিকর খাবারও কিনে দিতে পারি না। অনেক সময় তো পেট ভরে খাবারও দিতে পারি না,’’ বলেন জান্নাত বেগম। 

রোকসানা পারভীনজান্নাত বেগমের প্রতিবেশী তিনি বলেন, যে কোনো নারীর পক্ষে এত ছোটো ছোটো ৪টি বাচ্চা লালন-পালন করা কষ্টকর। সেখানে তাকে লালন-পালনের পাশাপাশি উপার্জনের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। জান্নাতকে দেখলেই বোঝা যায় একটা মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে।

আরেক প্রতিবেশী শারমিন হাসান বলেন, অনেক সময় তার বাচ্চাদের কান্নার শব্দ শুনলে খারাপই লাগে। এত ছোটো ছোটো বাচ্চা। বিত্তশালীরা কত কত জায়গায় সাহায্য-সহযোগিতা করে, কিন্তু জান্নাতকে সাহায্য করতে সেভাবে কেউ এগিয়ে আসেনি।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, বিষয়টা জানা ছিল না। আমি দ্রুত খোঁজ নেব। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঠাকুরগাঁও প্রশাসন যতটা সম্ভব তার পাশে দাঁড়াবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন