ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ মানেই ছাত্রলীগ—অন্য ছাত্র সংগঠন শুধু ছায়া ইতিহাসের

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি বহু সংগঠনে বিভক্ত হলেও, আদর্শিক ভিত্তি ও ইতিহাসের দায় শুধু একটি সংগঠনই ধারণ করে—বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার—প্রতিটি জাতীয় প্রয়াসে যে সংগঠন ছিল প্রথম সারিতে, তার নাম ছাত্রলীগ। অন্য অনেক ছাত্র সংগঠন এসেছে, কিছু সময়ের জন্য জনপ্রিয় হয়েছে, কিছু পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু জাতি গঠনে ভূমিকা আর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অবদান—এই দুইয়ের বিচারে ছাত্রলীগের সমান কোনো সংগঠন কখনো ছিল না, নেই, হবেও না।

ছাত্রলীগ—শুধু সংগঠন নয়, একটি ইতিহাস

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাত্রলীগ। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার লড়াইয়ে ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছিল ছাত্রলীগের সদস্যরা। ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাই ছিলেন সামনের কাতারে। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের হাজারো নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন, অনেকে অস্ত্র হাতে লড়েছেন, অনেকে গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেছেন।

এক কথায়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম যদি একটি রাজনীতির ফল হয়, তাহলে ছাত্রলীগ তার আন্দোলনের শিকড়।

ইসলামী ছাত্র সংঘ থেকে ছাত্রশিবির—দেশবিরোধিতার এক ইতিহাস

বিপরীতে, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্র সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলে ইসলামী ছাত্র সংঘ, যা পরে ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবির নাম ধারণ করে।

১৯৭১ সালে এই ছাত্র সংঘ এবং জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে আল-বদর বাহিনী গঠন করে। তারা মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে হত্যা করে। শুধু রাজনীতি নয়, ইতিহাসের বিরুদ্ধেও তাদের অবস্থান ছিল ঘৃণ্য ও বর্বর।

স্বাধীনতার পর ক্যাম্পাসে তাদের আরেক পরিচয় দাঁড়ায়—“রগ কাটা রাজনীতি”। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সিলেট, জাহাঙ্গীরনগর—বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ভিন্নমতাবলম্বীদের হাতের রগ কেটে দেওয়া, ত্রাস সৃষ্টি, জঙ্গিবাদী মতাদর্শ প্রচার, নারীশিক্ষার বিরোধিতা ইত্যাদির জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

ছবি: লেখক মেজবাউল ফেরদৌস স্বচ্ছ, ছাত্রলীগ নেতা।

ছাত্রদল—আসামিদের, অনিয়মিত ছাত্রদের সংগঠন?

১৯৭৯ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এই সংগঠনের মূল ভিত্তি আদর্শ নয়, ক্ষমতার আশ্রয়। এমনকি ছাত্রদলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী অনিয়মিত ছাত্র বা একেবারেই পড়ালেখা না করা মানুষ, যারা ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক ফায়দার জায়গা বানিয়েছে। দেখা গেছে, বহু অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ ও অপরাধী ছাত্রদল নেতা আদালতে “ছাত্র” পরিচয়ে জামিন পেয়েছে—এটাই বাস্তবতা।

ছাত্রদল কোনো গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেনি, কোনো ভাষা আন্দোলন, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে অগ্রণী হয়নি, এমনকি শহীদদের প্রতি সম্মানও দেয়নি।

ছাত্রলীগ মানেই নেতৃত্ব, আন্দোলন, আত্মত্যাগ

বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন, “ছাত্ররা রাজনীতি করবে”—ঠিক তেমনভাবেই ছাত্রলীগ গড়ে তুলেছে একের পর এক প্রজন্ম।
শেখ হাসিনা নিজেও ছাত্রলীগের পথ ধরেই রাজনীতির শিখরে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন, শাহবাগের গণজাগরণ, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অবস্থান—সব জায়গায় ছাত্রলীগ ছিল গর্বের সঙ্গে সোচ্চার।

আজকের ছাত্রদের জন্য বার্তা

আজকের প্রজন্মকে বুঝতে হবে—সব ছাত্র সংগঠন এক নয়। কিছু সংগঠন ইতিহাস বানিয়েছে, কিছু সংগঠন ইতিহাস বিকৃত করেছে। ছাত্রলীগ ছিল মুক্তির সংগ্রামের কাণ্ডারী, অন্যরা ছিল প্রতিরোধের বিপক্ষের দালাল।

এই প্রজন্মের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এই প্রজন্মকে এখনই বেছে নিতে হবে—তারা ইতিহাসের পক্ষে থাকবে, নাকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রের পেছনে দাঁড়াবে?

উপসংহার

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মানে দেশের মানচিত্র। যে সংগঠন বাংলা ভাষায় বলার অধিকার দিয়েছে, স্বাধীনতা এনেছে, গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছে, সেই সংগঠনের নাম ছাত্রলীগ। অন্য সংগঠনগুলো যদি আত্মস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, ছাত্রলীগ তখন জাতির স্বার্থের জন্য বুক চিরে দাঁড়ায়।

তাই আবারও বলি, বাংলাদেশ মানে ছাত্রলীগ—তাদের রক্ত, ঘাম, সাহস, আদর্শ, ইতিহাস আর আত্মত্যাগের নামই আজকের বাংলাদেশ।

লেখক: মেজবাউল ফেরদৌস স্বচ্ছ, ছাত্রলীগ নেতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন