কী আশ্চর্য এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা! একটি ভাষাগোষ্ঠী থেকে গড়ে উঠতে পারে একটি জাতি! বিশ্বের ইতিহাসে এমন উদাহরণ বিরল। ভারতবর্ষে হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা ৩০ কোটিরও বেশি, কিন্তু সেখানে কোনো ‘হিন্দি জাতি’ গড়ে ওঠেনি। অথচ পূর্ববাংলার ৫ কোটি মানুষের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ একদিন বাস্তবতার রূপ পায়। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন একজন মানুষ—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি ছিলেন শুধু একজন রাজনীতিক নন, ছিলেন জাতির স্থপতি, ইতিহাসের মহানায়ক, এবং এক গভীর আবেগের নাম।
৬৫’র যুদ্ধ এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভয়াবহ বাস্তবতা
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত। পশ্চিম পাকিস্তান তার সব সামরিক শক্তি নিয়োজিত রেখেছিল কাশ্মীর সীমান্তে। অথচ ভারত চাইলে তখন পূর্ব পাকিস্তানে অনায়াসে হামলা চালাতে পারত।
এই ভয়ংকর দুর্বলতা অনুভব করেছিলেন শেখ মুজিব। তখনই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু ভাষা নয়—স্বাধীন অস্তিত্বের জন্য দরকার সশস্ত্র প্রস্তুতি ও কৌশলগত নিরাপত্তা কাঠামো।

৬ দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ
১৯৬৬ সালে ঘোষিত ৬ দফা দাবি ছিল পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মুক্তির নীলনকশা।
এর ৬ নম্বর দফায় তিনি বলেন:
আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।”
শেখ মুজিব জানতেন, কেন্দ্রীয় সরকার কখনোই পূর্ব বাংলাকে সামরিকভাবে নিরাপদ রাখবে না। তিনি চেয়েছিলেন, বাঙালির নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। এই দফাটি শুধু কৌশলগত নয়, স্বাধীনতা অর্জনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ছিল।
১৯৭১: যুদ্ধে নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ মিত্রবাহিনী যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। ভারত প্রায় ৫ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করে, যাদের মধ্যে শহীদ হন ১২৫০ জন।
পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা এটি—এক দেশ আরেক দেশের স্বাধীনতার জন্য এত বড় সেনা মিশন চালায় এবং তারপরও সেই বাহিনী বিজয়ী হয়ে দেশে ফিরে যায়।
আজও জাপানে, আফগানিস্তানে, সৌদি আরবে কিংবা পাকিস্তানে মার্কিন সৈন্য ঘাঁটি করে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে? যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক চতুরতায় এবং মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মিত্রবাহিনীকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে কোনো বিদেশি সেনা অবস্থান করেনি—এটা ছিল শেখ মুজিবের বিচক্ষণতার ফল।
শেখ মুজিব: ইতিহাসের উষ্ণতম নাম
শেখ মুজিব কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, এক অনুভবের নাম।
একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন তিনি। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের ভিত্তিতে একটি জাতি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে পারে।
আমরা যারা আজ বাংলায় মাথা উঁচু করে কথা বলি, যাদের জাতীয় সংগীত বাংলা ভাষায়, যাদের জাতীয় পরিচয় ‘বাঙালি’—তারা সবাই শেখ মুজিবের ঋণী।
ইচ্ছে করে ছুটে যাই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে, কালো কোট পরা সেই মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে বলি—
“ধন্যবাদ, পিতা। আপনি না থাকলে, আমরাও থাকতাম না।”
কিন্তু আজ সেই পথ থেকে সরে আসা…
আজ আমরা দেখছি, বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে বিকৃত করা হচ্ছে, তার নামকে রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
যে আদর্শকে কেন্দ্র করে একটি জাতি জেগে উঠেছিল, সেই আদর্শ আজ অনেকের কাছে শুধুই শ্লোগান হয়ে গেছে।
ক্ষমতা, সুবিধা ও আত্মস্বার্থের রাজনীতির পেছনে আজ মুজিব শুধুই একটি ‘ব্যবহারযোগ্য মুখ’।
শেষকথা
আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করি, যারা ‘বাঙালি জাতি’ বলে গর্ব করি, তারা আজও তার দেখানো পথেই চলতে চাই।
আমরা জানি, তার মতো দূরদর্শী, সাহসী ও নিঃস্বার্থ নেতা বিরল।
তাই বুক ভরে বলি—
ক্ষমা করবেন, পিতা। আমরা হয়তো এখনো আপনার যোগ্য সন্তান হয়ে উঠতে পারিনি।
তবুও, আপনি আমাদের অহংকার।
লেখক: মেজবাউল ফেরদৌস স্বচ্ছ
কার্যকরী সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।




