নভেম্বর ২৮, ২০২১

সাগর পাড়ে পরিবেশ বিপর্যয়, জোয়ারে বিলুপ্ত ঝাউগাছ

সাগর পাড়ে পরিবেশ বিপর্যয়, জোয়ারে বিলুপ্ত ঝাউগাছ

সরকারিভাবে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করা না হলেও ঝাউবাগান এবং বিশাল চর দেখার জন্য সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়ায় নিয়মিত ভিড় করেন পর্যটকরা। কিন্তু বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের ঝাউগাছগুলো এখন জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে জর্জরিত। কোথাও উপড়ে গেছে ঝাউগাছ। আবার কোথাও গোড়ার মাটি সরে শুধু শেকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। অল্প কিছু মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউগাছেরও অনেকগুলো মৃতপ্রায়।

উপকূলীয় বন বিভাগ বলছে, সৈকতটি রক্ষা করতে হলে দ্রুত সময়ে ম্যানগ্রোভ বনায়ন করতে হবে। না হলে এ ভাঙন রোধ করা যাবে না। এ ঝাউগাছগুলো এক সময় বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়ানোর পাশাপাশি সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের কবল থেকে উপকূলবাসীকে বাঁচানোর প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একের পর এক গাছ উপড়ে পড়ায় সমুদ্র সৈকত এখন গাছশূন্য প্রায়। ফলে পর্যটন সম্ভাবনা স্থান হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারাচ্ছে প্রকৃতিও।

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বাঁশবাড়িয়ায় ১৯৬৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে ৩ হাজার ৫০৮ হেক্টর জমিতে গাছ লাগানো হয়। বর্তমানে সেই গাছের অর্ধেকেরও বেশি বিলীন হয়ে গেছে।

সরেজমিনে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সাগরের বিশাল ঢেউ ঝাউবাগানে আছড়ে পড়ছে। বারবার আঘাত হানছে গাছগুলোর ওপর। এতে সাগরতীরে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাটি ধসে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে আছে। যে গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোরও শেকড়ের নিচে মাটি নেই। স্থানীয়রা জানান, গত দুই বছর ধরে জোয়ারের ঢেউ ও স্রোত ভাঙতে শুরু করেছে পর্যটন ও বিনোদনের এ জনপ্রিয় সৈকত। এভাবে ভাঙতে থাকলে সৈকতের সব ঝাউগাছই বিলীন হয়ে যাবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান, সালাউদ্দীন ও করিম বলেন, জোয়ারের ঢেউয়ে ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে বিলীন হতে হতে ঝাউবাগানের এক-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট রয়েছে। এটুকু ভেঙে গেলে পর্যটকরা আর আসবে না এখানে। সমাজকর্মী প্রভাস দাশ বলেন, বেড়িবাঁধের বাইরের ঝাউবাগান থেকে সাগর ছিল আরও অন্তত এক কিলোমিটার দূরে। ঝাউবাগানের বাইরের অংশ মাটির ওপর ঘাসের আস্তর। তারপর বালির স্তর। তারপর ছিল লোহার একটি সেতু। এখন এক কিলোমিটার হাঁটাপথ আর নেই। তিন বছর আগে একটি শিল্প গ্রুপ সাগর থেকে বালি উত্তোলনের কারণে ভাঙন শুরু হয়। এখন নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে ঝাউবাগানটিও।

উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, একটি শিল্প গ্রুপ চার বছর আগে উপকূলের অদূরে বালি উত্তোলন করে। এরপর থেকে সাগরের ওই গর্ত ভরাট হতে গিয়ে উপকূলে ভাঙনের শুরু হয়। ২০১৮ সালের ২১ জুন ও ৬ জুলাই সৈকতটিতে গোসলে নেমে গর্তের চোরাবালিতে ডুবে পাঁচ তরুণের মৃত্যু হয়। অথচ সে বছরের ১১ ফেব্রæয়ারি বাঁশবাড়িয়া সাগর উপকূলকে ‘সমুদ্র সৈকত’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সীতাকুণ্ড সমিতি চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছিল।সীতাকুণ্ডর পরিবেশবাদী সংগঠক ইঞ্জিনিয়ার কামরুদ্দোজা বলেন, শুধু বাঁশবাড়িয়া নয়, পুরো সীতাকুÐকে গিলে খেয়েছে শিল্প গ্রুপগোল। বালু উত্তোলন ও কৃষিজমি গ্রাসের নেতিবাচক প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে। শিল্প গ্রæপগুলো যখন সাগর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছিল তখন আমরা অনেক প্রতিবাদ করেছি। পত্রপত্রিকায় অনেক রিপোর্টও হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই চুপ ছিল।

উপকূলীয় বন বিভাগের সীতাকুণ্ড রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, ওই সৈকতটিতে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল করার জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এ প্রকল্প অনুমোদন হলে বর্ষা শেষে সেখানে নতুন গাছের চারা লাগানো হবে। না হলে সৈকতের অবশিষ্ট গাছ রক্ষার উপায় নেই।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের পত্রিকা
ই-পেপার
শেয়ার বাজার
পন্য বাজার