নভেম্বর ২৮, ২০২১

সংবাদপত্র শিল্প কি টিকবে

  • অনিশ্চয়তার অন্ধকারে সংবাদশ্রমিকরা
  • পেশায় ঝুঁকি বাড়ছেই

সকালে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ের সঙ্গে পত্রিকা না হলে কি চলে? দিনটা কেমন পানসে, শূন্য শূন্য মনে হয়। জগতের কোথায়, কী ঘটছে, কেন ঘটছে- সে সব যেন অজানাই থেকে যায়…। দৈনিক পত্রিকা নিয়ে এমন অনুভূতি দেড় দশক আগেও ছিল জোরালো। ঘরে দৈনিক রাখার মধ্যে এক ধরনের আভিজাত্য, সংস্কৃতি আর উন্নত রুচিবোধের পরিচয়ও ফুটে উঠতো। তবে আজ সেই বোধ আর নেই। এখন সকালে ঘুম ভাঙলেই চোখ যায় স্মার্টফোনের দিকে। দেশ-বিদেশের রাশি রাশি সংবাদ এসে ভিড় করে চোখের সামনে। রিমোট টিপলেই গোটা বিশ্ব হাজির টিভির পর্দায়। দরজার ওপাশে হকারের রেখে যাওয়া দৈনিকটি অলস পড়ে থাকে। সেদিকে তাকানোর আর সময় হয় না।

মাত্র দুই থেকে দেড় দশকের ব্যবধানে সংবাদমাধ্যমের এমন এক বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি আমরা। সময়ের বিবর্তন আর তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব এভাবেই বদলে দিয়েছে সংবাদ বা খবরের পঠন-পাঠনের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি, আবেগ আর অনুভূতি। তবে সংবাদমাধ্যমের দিন বদলের এই হাওয়াকে ঝড়ো রূপ দিয়েছে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারি। লকডাউনে ঘরবন্দী সময়ে ইন্টারনেট প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল মাধ্যমে সংবাদের বিস্তার ও পাঠ জনপ্রিয় হতে থাকে। বিপরীত দিকে দেশে-বিদেশে বহু দৈনিকের ছাপা বা প্রিন্ট সংস্করণ কমতে বা বন্ধ হতে শুরু করে। বিজ্ঞাপনের সিংহভাগ আয় স্থানান্তর হতে থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। সংবাদমাধ্যমের বিজনেস মডেল দ্রুতই বদলে যেতে শুরু করে। এতে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পড়তে থাকে ছাপা পত্রিকা।

সংবাদমাধ্যমের বৈশিষ্ট্য বদলের বিশ্বব্যাপী এই প্রবণতা আমাদের দেশীয় দৈনিকগুলোর টিকে থাকার সংগ্রামকে সম্প্রতি আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী সংবাদপত্র একটি শিল্প হলেও ২০১৪ সালে সরকার এ খাতকে সেবাশিল্প হিসেব ঘোষণা করে। তবে সেই ঘোষণার আট বছরেও শিল্পের কাঠামো পায়নি দেশের অন্যতম বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী এ খাত। বরং দিন দিন রুগ্ণশিল্পে পরিণত হয়েছে। এর ওপর করোনার দুঃসময় এসে প্রায় প্রতিটি পত্রিকার সরবরাহ লাইন ভেঙে দিয়েছে। বিজ্ঞাপন নেমে এসেছে এক চতুর্থাংশে। বেতন কমানো, লোকবল ছাঁটাই, ওয়েজবোর্ড অন্তর্ভুক্তদের চাকরির অবসান, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা এ খাতে নিয়োজিত সাংবাদিক বা সংবাদশ্রমিকদের জীবন একেবারেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে এ খাত নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে।

আমাদের জাতীয় ইতিহাস আর ঐতিহ্যসমৃদ্ধ সংবাদপত্র আর সাংবাদিকতা যে আজকের দিনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে তা হয়তো আগে থেকে ভাবতেই পারেননি কেউ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমল বাদ দিলে বিগত শতকের পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকের স্বাধিকার আর স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বাপর অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে আমাদের সংবাদমাধ্যমের। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালীন রাজনীতি আর সামাজিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য সৃষ্টিতেও অবদান ছিল অসামান্য। গেল অর্ধশত জুড়ে এই অভিযাত্রা বিশ্লেষণ করলে মোটা দাগে চারটি অধ্যায় বা যুগের নিরিখে সংবাদমাধ্যমের বিশেষ ভূমিকা দেখা যায়।

পঞ্চাশ থেকে আশির দশক পর্যন্ত দেশে ‘রাজনৈতিক সাংবাদিকতা’র বৈশিষ্ট্য বা চরিত্র দেখা যায়। যে সময় রাজনৈতিক কর্মসূচি, বক্তব্য, সভা-সেমিনার, রাজনীতির গতি-প্রকৃতিভিত্তিক সাংবাদিকতারই প্রাধান্য পায়। যেখানে স্বাধিকার, স্বাধীনতা, রাজনৈতিক আদর্শ বা দর্শনের ভূমিকাই ছিল মূখ্য। এরপর নব্বইয়ের গণআন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর সময়ের প্রয়োজনেই ‘বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’র সংস্কৃতি চালু হয়। এ সময় বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের পাশাপাশি, মুক্তবুদ্ধিচর্চা, স্বাধীন মতামত প্রকাশ, রুচিশীলতা, মৌলবিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। যদিও একই সময়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন ঘটলে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের ব্যাপক প্রভাব পড়ে সংবাদমাধ্যমে। তবে একবিংশ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত এ ধারার সাংবাদিকতার চর্চা অব্যাহত থাকে।

পরবর্তীতে নতুন শতাব্দির আগমনে বৈশ্বিক নানা পরিবর্তনের আলোয় তরুণ প্রজন্মের ধ্যান-ধারণা, সংস্কৃতিও পাল্টে যেতে থাকে। গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে বদল ঘটতে থাকে অর্থনৈতিক সংস্কৃতিরও। এসব কারণে পাল্টে যেতে থাকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা ও ধরন। এর ওপর চলমান একবিংশ শতকের শূন্য দশকে ব্যাপকহারে সম্প্রচার মাধ্যমের (টেলিভিশন, রেডিও) বিস্তার ঘটে। এমন এক প্রেক্ষাপটে দেশে সাংবাদিকতার তৃতীয়ধারা তথা ‘করপোরেট সাংবাদিকতা’র যাত্রা শুরু হয়। বিশ্বমিডিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা বা রীতিনীতি নির্ধারণের চেষ্টা চলে। মালিক বা উদ্যোক্তারা করপোরেট দৃষ্টিভঙ্গিতে সংবাদমাধ্যমকে নিজস্ব বিজনেস মডেলের অন্তর্ভূক্ত করে নেয়। এতে ভিন্ন এক সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক সংবাদমাধ্যম।

অবশ্য শূন্য দশকের মাঝামাঝিতে করপোরেট ধারার পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল রেখে দেশে অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে চতুর্থ অধ্যায় অনলাইন সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়। হার্ড থেকে সফট কপির সংস্কৃতির প্রচলন হতে থাকে। গেল দেড় দশক ধরেই এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ধারায় দেখা দিয়েছে বিপ্লব। মূলধারা হিসেবে স্বীকৃত ছাপা পত্রিকার সমান্তরালে অনলাইনও অগ্রাধিকার বা মূখ্যধারা হিসেবে গড়ে উঠছে। যদিও এখন অবধি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ের স্থানীয় বিজ্ঞাপননির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিজনেস মডেল দাঁড় করানো যায়নি। বৈপ্লবিক এই সময়ে ছাপা পত্রিকা এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নানা পরিকল্পনায় এই সংকট কাটানোর চেষ্টাও চলছে।

এমন বাস্তবতায় প্রচলিত মূলধারা বা সংবাদপত্র শিল্পে টেকসই বিজনেস মডেল তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে উদ্যোক্তাদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। তবে বিদ্যমান নানা সংকট আর জটিলতার কারণে এ শিল্প এখনও টেকসই কিংবা সার্বিকভাবে মুনাফামুখী হয়ে ওঠেনি। করোনাকালে গেল ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আগে নোয়াবের পক্ষ থেকে পাঁচ দফাসংবলিত লিখিত প্রস্তাবে সংকটময় মুহূর্তে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এতে বিজ্ঞাপনের বকেয়া বিল পরিশোধের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোগ ছাড়া বড় সংকটের আর সুরাহা হয়নি। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরেও সংবাদপত্রের জন্য কোনো বাজেট রাখা হয়নি।

সংবাদপত্রের করপোরেট ট্যাক্স কমানো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম চড়ে যাওয়া নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাতিল করা, বিজ্ঞাপনী আয়ের ওপর উৎসে কর কমানোর মতো উদ্যোগ নেয়া হয়নি আজও। জনসেবা বা তথ্য সেবাশিল্প হিসেবে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ না নেয়ায় পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়ছে এ খাতে কর্মরত হাজার হাজার কর্মীদের জীবন-জীবিকার ওপর। পেশাগত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে অবসরকালে শূন্যহাতে ঘরে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এ শিল্প নিয়ে চরম নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে সমাজে। দক্ষ আর যোগ্যকর্মীরা পেশা থেকে বিদায় নিতে শুরু করেছেন।

এমনিতেই সাংবাদিকতা পেশা অন্য আর দশটি পেশার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর ওপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংবাদকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই আইনের কিছু ধারা পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন সাংবাদিকরা। তবে এখন পর্যন্ত ভয়মুক্ত হতে পারেননি তারা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কার কতটা লাভ বা ক্ষতি হয় বা হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনার চেয়েও বড় কথা, সংকটে নিমজ্জিত সংবাদপত্র শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে এটা এক ধরনের বাধা। এতে একই সঙ্গে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে।

তবে এতকিছুর পরেও দেশে সংবাদপত্র শিল্পে অবিশ্বাস্যভাবে বিনিয়োগ বেড়েছে। এ খাতে চলতি শতকের গোড়ার দিকে শুরু হওয়া বিশাল বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রয়েছে এখনও। তবে ছাপা পত্রিকার ক্ষেত্রে বিশাল বিনিয়োগের বিষয়টি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের নতুন যাত্রা শুরু হলেও পাঠকপ্রিয় বা মু্নাফামুখী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তেমন বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম হচ্ছে না। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জয়জয়কারের এ যুগে ছাপা পত্রিকার সংবাদ পরিকল্পনা ঠিক কী হবে বা হওয়া প্রয়োজন তা নিয়ে গবেষণা হতেই পারে।

তবে সময়ের সঙ্গে মিল রেখে প্রথাগত সংবাদ পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নতুন ভাবনার সঙ্গে টেকসই বিজনেস মডেল পরিকল্পনার মধ্যেই খুঁজতে হবে সংবাদমাধ্যমের বিনিয়োগ সফলতা। সংবাদপত্রের মহাসংকটের এই সময়ে উন্নত বিশ্বে গোষ্ঠীবদ্ধ বা কমিউনিটি সাংবাদিকতা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সম্প্রতি আমাদের দেশেও ভিন্ন পরিকল্পনায় বিশেষায়িত বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম বা পত্রিকা বাজারে এসেছে বা আসছে। তাদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ সফলতা কতটা হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এটা সত্য যে ঝুঁকিপূর্ণ এসব উদ্যোগ ব্যর্থ হলে প্রচলিত সংবাদপত্র শিল্প টিকবে কিনা সে প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দেবে।

বাজার/এম.আর

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের পত্রিকা
ই-পেপার
শেয়ার বাজার
পন্য বাজার