ডিসেম্বর ১, ২০২১

সংকটে ঝাড়–শিল্প, প্রয়োজন ঋণ সহায়তা

সংকটে ঝাড়–শিল্প, প্রয়োজন ঋণ সহায়তা
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার এলংগীপাড়া গ্রামে ঝাড়ু তৈরি করছেন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নাইম। ছবি-কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের এলংগীপাড়া গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ বাড়ির সামনে, উঠানে ও রাস্তার পাশে শণ-খড় পরিষ্কারের পাাশাপাশি খড়ের গাদা (পালা) তৈরি, ঝাড়ু বা বারুন তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঝাড়–র কারিগররা। ঝাড়ুশিল্পের শত বছরের ঐতিহ্য থাকলেও মিলেনি কুটিরশিল্প হিসেবে বিসিকের স্বীকৃতি। এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। এতে পরিবর্তন হয়নি তাদের ভাগ্যের।

অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় এ ঝাড়– শিল্প নানা প্রতিকূলতার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে। ঝাড়ুশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। শুধুমাত্র সরকারের সহযোগিতা এবং বিসিকের স্বীকৃতি পেলে কুমারখালীর হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে ঝাড়ুশিল্পে। পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এলাকা অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বংশ পরম্পরায় ঝাড়–শিল্পকে পেশা হিসেবে ধরে রেখেছেন এলংগী পাড়ার ব্যবসায়ী ও কারিগররা। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও শত বছর ধরে শতাধিক পরিবার ঝাড়ুশিল্পকে সন্তানের মতোই বুকে আগলে রেখেছেন। আগে হাজারো পরিবার এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে শতাধিক পরিবারে। আবার যে পরিবারগুলো পূর্বপুরুষদের কর্মটি ধরে রেখেছেন, তারাও রয়েছেন বিভিন্ন সমস্যায়। সংসারের স্কুলপড়ুয়া সন্তান থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও সারাদিন এ কাজে নিয়োজিত থাকেন। কারণ তাদের আয়ের একমাত্র উৎস ঝাড়–শিল্প।

ঝাড়ুশিল্প ব্যবসায়ী ও কারিগর ওমর ফারুক বলেন, ঝাড়ু তৈরির প্রধান কাঁচামাল শণখড় এখানকার কারিগরদের দূরদূরান্ত থেকে কিনে আনতে হয়। বছরের চৈত্র, বৈশাখ মাসসহ মাত্র কয়েক মাস পর্যাপ্ত শণখড় পাওয়া যায়। কিন্তু সারা বছর কাজ চলমান রাখার জন্য খড় কিনে মজুত রাখতে হয়। তিনি আরও বলেন, এখানকার কারিগররা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় পর্যাপ্ত খড় কিনে মজুত করতে পারে না। অনেকে বেসরকারি বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কাঁচামাল সংরক্ষণ করে। কিন্তু সেখানে অধিক সুদ হওয়ায় প্রতিবছর ঋণ নিয়ে কাঁচামাল মজুত করা সম্ভব হয় না। সরকারের কাছে ঋণ সহায়তা দাবি করেন তিনি।

বুলবুলি খাতুন বলেন, ফরিদপুর, পাবনা, ঢাকা, পিয়াজখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খড় কিনে নিয়ে আসি। সেই খড় থেকে ঝাড়– তৈরি করি। এলংগী পাটা এলাকার ঝাড়ু রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা, মেহেরপুর, রাজবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। এখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনোরকমে আমাদের সংসার চলে। প্রতিটি ঝাড়– তৈরি করতে ৫ থেকে ৬ টাকা ব্যয় হয়। ঝাড়– পাইকারি বিক্রি হয় ৭ থেকে ৮ টাকা। খুচরা বিক্রি হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নাইম আলী বলে, পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যা থাকার কারণে পড়ালেখার পাশাপাশি ঝাড়– তৈরির কাজ করি। প্রায় তিন বছর ধরে আমি এ কাজের সঙ্গে যুক্ত আছি। স্কুলে যাওয়ার আগে ও পরে কাজ করি। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয়। ব্যবসায়ী আকাশ হোসেন বলেন, বহু বছর ধরে ঝাড়– তৈরির কাজ করে আসছে আমাদের গ্রামের পূর্বপুরুষরা। আমার মতো ১৫০ থেকে ২০০ পরিবার এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। অর্থের অভাবে আমরা ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারি না। সরকারি সহযোগিতা ও অর্থের অভাবে অনেকেই এ ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আমি সরকারের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানাচ্ছি।

ববিতা খাতুন বলেন, আমরা এনজিও থেকে সুদে টাকা নিয়ে ব্যবসা করি। সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনা। সরকার ঋণের ব্যবস্থা করলে আমরা আরও ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারি। বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক সোলায়মান হোসেন বলেন, ঝড়–শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারিভাবে তাদের সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাদের কোনো সংগঠন নেই। আমি তাদের একটি সংগঠন তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। পরে তারা আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেনি। যোগাযোগ করলে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

আরও পড়ুনঃ  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খুলতে বিকেলে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

কুমারখালী উপজেলা নির্বাহি অফিসার (ইউএনও) বিতান কুমার মন্ডল বলেন, শতাধিক পরিবার শত বছর ধরে এলংগী এলাকায় ঝাড়– তৈরির কাজ করছে। উদ্যোক্তার খোঁজে এলাকা ও তাদের কাজ পরিদর্শন করেছি। তাদের ভাগ্যবদলে ও কাজটিকে আধুনিক করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের পত্রিকা
ই-পেপার
শেয়ার বাজার
পন্য বাজার