আগস্ট ১৯, ২০২২

নদীতে কমেছে ইলিশ

লোকসানে বন্ধ জাল-সুতার কারখানা

লোকসানে বন্ধ জাল-সুতার কারখানা
  • দেড় কোটি টাকার সুতা ও জাল অবিক্রিত
  • অনিশ্চিত সাড়ে ৪শ শ্রমিকের কর্মসংস্থান

চাহিদা কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ইলিশ জাল ও সুতা তৈরীর নোয়াখালীর একমাত্র কারখানা। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অব্যাহত লোকসানের মুখে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন মালিক পক্ষ। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন কারখানায় কর্মরত ৪৫০ জন শ্রমিক। সেই সঙ্গে কারখানায় অবিক্রিত পড়ে আছে প্রায় দেড় কোটি টাকার জাল ও সুতা। এ পরিস্থিতিতে বেকার শ্রমিকেরা পরিবার পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

জানা গেছে, ইলিশ জাল তৈরির ২৫টি ও সুতা তৈরির ৮টি মেশিন নিয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ বিসিক শিল্প নগরীতে কারখানা চালু করেন মেসার্স ফরিদ ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড। যেখানে কর্মসংস্থান হয় ৪৫০ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিকের। ম্যানেজারসহ রয়েছেন আরও চারজন কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি মাসে এ কারখানা থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকার সুতা ও জাল তৈরি হতো। মাঝে করোনার ধাক্কায় কিছুটা স্থবির হওয়ার পরও পরবর্তীতে আবারও সচল হয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু বর্তমানে বাজার চাহিদা কমে যাওয়া ও উৎপাদিত মালামাল মজুদ থাকায় বিপাকে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একটি একটি করে পর্যায়ক্রমে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে ৩৩টি মেশিন। এতে বিপাকে পড়েছে কারখানাটিতে কর্মরত ৪৫০ জন শ্রমিক, অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা বলছেন বাজারে চাহিদা বাড়লে আবার প্রাণফিরে পাবে প্রতিষ্ঠানটি, তবে সে কবে নাগাদ হচ্ছে তা জানা নেই তাদের।

সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে ফরিদ গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু করা হয় মেসার্স ফরিদ ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড। যেখানে জাল ও সুতা তৈরির জন্য বিদেশ থেকে আনা হয় প্রায় ৬৫ লাখ টাকার মেশিন ও যন্ত্রপাতি। সেই মাস থেকে এ কারখানা থেকে প্রতিমাসে দেড় লাখ কেজি সুতা ও এক লাখ কেজি ইলিশ জাল তৈরি করা হতো। প্রতি কেজি সুতা ১৮০ টাকা এবং প্রতি কেজি জাল বিক্রি হতো ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। যা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত চলামান ছিলো। ২০২১ সালের মার্চ মাস থেকে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় কমতে থাকে উৎপাদন।

আরও পড়ুনঃ  সূর্যমুখীতে পর্যটনের হাতছানি

প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সুতা তৈরির কাঁচামাল হিসেব আনা হয় পাইবার (আঁশ)। যা কারখানায় আনার পর মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করনের মাধ্যমে প্রথমে সুতা ও পরে তা থেকে তৈরি করা হয় জাল। এ প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি জাল কুমিল্লার প্রধান কার্যালয় থেকে নোয়াখালীর হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, টেকনাফ, ঢাকা, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, রামগতি, আলেকজেন্ডার ও বরগুনাসহ দেশের সকল উপকূলীয় অঞ্চলে ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। এ জালগুলো বিশেষ করে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ শিকারে ব্যবহার করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, প্রতিমাসে প্রতিষ্ঠানটি ৪৫০জন শ্রমিক, একজন ম্যানেজার, একজন হিসাব রক্ষক, একজন ক্যাশ সহকারি ও একজন স্টোরম্যানের বেতন বাবদ ২৬ থেকে ২৭ লাখ টাকা প্রদান করতে হয়। কারখানায় মেশিনের প্রতিদিন ৪০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। যার বাজার মূল্য ১৪ হাজার টাকা, প্রতিমাসে ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকার পানি দরকার হয়। প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল আসে ৫ লাখ টাকা। তবে, গত বছরের প্রথম থেকে কারখানায় উৎপাদন কমে গেলেও কমেনি খরচ। মার্চের পর থেকে বন্ধ হতে থাকে একটি করে মেশিন। গত ডিসেম্বরের শুরু থেকে প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য একটি মেশিন চলমান ছিলো। যা চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে একবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে কারখানা ছেড়ে গেছে কর্মচারিরা। বর্তমানে এ কারখানার স্টোরে ৯ হাজার ৫০ কেজি সুতা এবং জাল আছে ৩১ হাজার কেজি, যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। 

আরও পড়ুনঃ  বর্ষাকালের তুলনায় এখনো কমেনি বায়ু দূষণ

নুরুল ইসলাম নামে এক শ্রমিক জানান, কারখানাটিতে সুতার মেশিনে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে কাজ করে আসছে সে। কোম্পানীর প্রোডাকশন ভালো থাকা প্রতিমাসে সময়মত বেতন পেয়ে যেতেন। মাঝে মধ্যে ওভারটাইম করলে মিলত অতিরিক্ত টাকা। তবে, গত বছর থেকে মার্কেটে জালের চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমে যায়। ডিসেম্বর মাসের অর্ধেক বেতন ফেলেও বর্তমানে বেকার তিনি। দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান ছেড়ে এখন কি করবেন তা ভেবে হাতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

মিতু ও কুলসুম আক্তার নামের দুই নারী শ্রমিক বলেন, মেশিন থেকে বের হওয়ার পর জাল গোছানোর কাজ করতেন তারা দুই জন। কারখানাটির উৎপাদন কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। হঠাৎ করে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়াও কষ্ট কর।

নোয়াখালীর চৌমুহনী বাজারে পাইকারি জাল বিক্রেতা খোরশেদ আলম ও রুহুল আমিন জানান, চৌমুহনীতে ইলিশের জাল বিক্রির পাইকার তাঁরা দু’জন, এর বাইরে সোনাপুর বাজারে ভাই ভাই হাডওয়ার ও সোনালী হাডওয়ার নামের দু’টি প্রতিষ্ঠানেও বিক্রি করা হয় ইলিশ জাল। তাঁরা আরও জানান, প্রতি বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার জাল বিক্রি হতো প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে, গত বছরের শেষের দিকে নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় জেলেরা আগেরমত মাছ শিকারে নদীতে নামছে না। যার কারণে জালের ব্যবহার কম হওয়ার কারনে নষ্টও কম হচ্ছে, তাই জেলেদের নতুন জাল নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। নদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছ শিকার করতে পারলে জালের ব্যবহার বেশি হতো, তাহলে প্রতি বছর নতুন জাল ক্রয় করা লাগতো জেলেদের। এতে জালের বিক্রিও বাড়তো।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.

ই-পেপার
প্রথম পাতা
খবর
অর্থ-বাণিজ্য
শেয়ার বাজার
মতামত
বিশ্ব বাণিজ্য
ক্যারিয়ার
খেলার মাঠ
প্রযুক্তি বাজার
শিল্পাঞ্চল
পণ্যবাজার
সারাদেশ
শেষ পাতা