ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৩

প্রেসিডেন্ট পার্কে শুধুই নীরবতা

মোহাম্মদ ওমর ফারুক :

প্রেসিডেন্ট পার্কে আর প্রেসিডেন্ট আসবেন না। যেখানে জীবনের বিশটি বছর কাটিয়েছিলেন তিনি। বলছি সাবেক প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও একাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথা। গতকাল রোববার সকাল পৌনে আটটায় তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এ মারা যান। তার মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট পার্কে নেমে আসে শোকের ছায়া। বারিধারার গমগমে বাড়িটি আজ শুধু নীরবতা।

শোক প্রকাশ করার জন্যেও দেখা যায়নি কাউকে। এদিকে এরশাদের ছোটভাই জীএম কাদেরের কড়া নির্দেশে প্রেসিডেন্ট পার্কে বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। ফলে নেই কোনো আত্মীয় স্বজন বা নেতাকর্মীদের ভীড়।

কেউ কেউ এসে বাড়ির সামনে বসে সাবেক প্রেসিডেন্টের জন্য দোয়া করে যাচ্ছেন। কথা হয় একসময়ে এরশাদের বাসার ইলেক্ট্রটিশিয়ান সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। বিদিশার সঙ্গে যখন এই বাসায় সংসার শুরু করেছিলেন এরশাদ, তখন তিনি এই বাসায় কাজ করতেন।

সাইফুল বলেন, আমি গোপালগঞ্জ থেকে এসেছি। সকাল বেলায় যখন শুনেছি এরশাদ স্যার মারা গেছেন, তখনই আমি এখানে এসেছি। স্যার আমাকে জীবনে অনেক সহযোগিতা করেছেন। জীবনে যখন প্রথম ব্যবসা শুরু করেছি তখন তিনি আমাকে লাখ খানেক টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়েই ব্যবসা করে আজ আমি কোটিপতি। সবটাই স্যারের দয়া। এই বাসায় দশ বছর কাজ করেছি। এই মায়ায় এখানে এসেছি। প্রেসিডেন্ট পার্কে সারাদিনে সাইফুলের মতো বেশ কয়েকজন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। যারা এরশাদের শুভাকাঙ্খি।

এই বাসাটিতে এরশাদ বসবাস শুরু করেন ২০০১ সাল থেকে। পরে প্রায় ১৯ বছর এখানে তিনি ছিলেন তার ছোট ছেলে এরিক এরশাদকে নিয়ে। প্রেসিডেন্ট পার্কের ছয় তলায় ৭ হাজার ৪’শ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন তিনি। এরশাদের এই বাড়িটির জায়গার মালিক ছিলেন সাবেক জ্বালানী মন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন। পরে জায়গাটি চারপাঁচ হাত ঘুরে সর্বশেষ জায়গাটি কিনেন এইচএম মোর্শেদ। পরে এইচএম মোর্শেদ এরশাদকে জায়গাটি দানপত্র করে দেন। ১৯৯৯ সালে কনকর্ডকে এই জায়গাটি দেয়া হয় প্রেসিডেন্ট পার্কটি করার জন্য। নিয়ম অনুযায়ী এই বাড়িটির ৬০ ভাগ ফ্লাট পান কনকর্ড আর বাকি ৪০ ভাগ পান এরশাদ। সেই হিসেব এরশাদ এখানে পেয়েছিলেন চারটি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে পাঁচতলায় দু’টি ফ্ল্যাট লিখে দেন সাবেক স্ত্রী বিদিশার নামে। পরে এরশাদের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে ফ্ল্যাটটি বিদিশা আমেরিকান এক প্রবাসীর কাছে বিক্রি করে দেন। এর আগে পাঁচ তলায় এই ফ্ল্যাটটিতে বিদিশাকে নিয়ে সংসার শুরু করেন এরশাদ।

আরও পড়ুনঃ  করোনায় আবারও একদিনে বিশ্বে রেকর্ড মৃত্যু

এরশাদ সর্বশেষ ছয়তলায় দু’টি ফ্ল্যাট ভেঙ্গে এক করে সেখানে থাকতেন তিনি। এই ফ্ল্যাটটি ফার্স্ট সিকিউরটি ব্যাংক লিমিটেডের কাছে মর্গেজ দেয়া। মর্গেজ নাম্বার ২৯০৭/১। বাড়িটির ছাদে এরশাদের ব্যায়ামাগার ছিলো। প্রতিদিন সকালে তিনি সেখানে ব্যায়াম করতেন। ব্যায়াম শেষে তিনি বিভিন্ন ফলের জুস খেতেন। ডালিমের জুস তার খুব পছন্দের ছিলো। সকালের নাস্তা বলতে শুধু একপিস পাউরুটি। এরপর তিনি বাসায় অফিস করতেন। দুপুরে খাবার খেতেন একটায়। তার পছন্দের খাবার ছিলো পাবদা ও বোয়াল মাছ। এসব মাছ আসতো সিলেটের হাওর অঞ্চল থেকে।

এরশাদের এ বাড়িতেই ছিলো তার ব্যক্তিগত ৬টি গাড়ি। প্রাডো, মার্সিডিজ বেঞ্জ, ল্যান্ডক্রুজার, নিশান আর ছিলো দু’টি মাইক্রোবাস। এরশাদ চারটি গাড়িতেই নিয়মিত চলতেন। তার এসব গাড়ি চালানোর জন্য তিনজন ব্যক্তিগত চালক ছিলেন। তারা হলেন- আব্দুল মান্নান, আব্দুল আজিজ ও ওয়াদুদ।

সর্বশেষ ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আব্দুল আজিজের গাড়িতে করেই সিএমএইচ এ যান এরশাদ। আজিজ বলেন, স্যার প্রায়সময় বলতেন আমি আর মনে হয় বাঁচবো না। আমাকে কেন হাসপাতালে নেয়া হয়। আজিজ আরো বলেন, স্যার শেষ সময়ে খুব নার্ভাস ছিলেন। অল্পতেই কেঁদে ফেলতেন। শুধু মৃত্যু নিয়ে কথা বলতেন। এর আগে ২৫ তারিখ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে সিএমএইচে আসা যাওয়া করেন প্রায় পাঁচ থেকে দশবার। স্যারের কিছু হলেই তিনি সিএমএইচে যেতেন। সেখানে একমাত্র তার জন্য একটি ভিআইপি ক্যাবিন ছিলো।’

এরশাদ ব্যায়াম করতে পছন্দ করলেও শেষ সময়ে অসুস্থ থাকার কারণে তিনি ব্যায়ম করতে পারেননি। জীবনের শেষ সময়ে তিনজন লোক তার বাসায় সার্বক্ষনিক দেখাশুনা করতেন।

শেষ সময়ে আপজন বলতে এরশাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পার্কে ছিলেন তার সন্তান এরিক। এরিক তার বাবার মৃত্যু খবর শুনে ছুটে যান সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)-এ। এর পর থেকে অশান্ত হয়ে ওঠেন এরিক। বাসায় দিকবেদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। একটু পর পর হাইমাউ করে কান্না করছেন। বাসায় দু’জন গৃহকর্মী তাকে দেখাশুনা করছেন।

আরও পড়ুনঃ  চালু হলো আরও ১৮ জোড়া লোকাল ট্রেন

বাবার মৃত্যুর সংবাদ শুনার পর থেকেই কিছুই খাচ্ছেন না তিনি। এদিকে মা বিদিশাও যোগাযোগ করেননি শোকাহত সন্তান এরিকের সঙ্গে। বাবার মৃত্যুর শোকে ভেঙ্গে পড়েছেন তিনি। ১৮ বছরের এরিক বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশাল স্কুল এন্ড কলেজ নির্ঝরে অষ্টম শ্রেনির শিক্ষার্থী।

এরশাদের ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আব্দুল মান্নান জানান, সকাল বেলায় এরিককে নিয়ে স্কুলে যান তিনি। সাড়ে আটটার দিকে এরশাদের আরেক ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আব্দুল আওয়াল তাকে ফোন করে বলেন এরিককে স্কুল থেকে নিয়ে আসার জন্য, এরশাদের অবস্থা তেমন একটা ভালো না। গাড়ি চালক মান্নানের কাছেই প্রথম শুনতে পান বাবার মৃত্যুর খবর। তখনই এরিককে নিয়ে গাড়ি করে আব্দুল মান্নান সোজা চলে যান সিএমএইচে।

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ই-পেপার
প্রথম পাতা
খবর
অর্থ-বাণিজ্য
শেয়ার বাজার
মতামত
বিশ্ব বাণিজ্য
ক্যারিয়ার
খেলার মাঠ
প্রযুক্তি বাজার
শিল্পাঞ্চল
পণ্যবাজার
সারাদেশ
শেষ পাতা