জানুয়ারি ২৮, ২০২২

ধুকছে সম্ভাবনাময় চিংড়ি খাত

চিংড়ি খাত

ধুকছে সম্ভাবনাময় চিংড়ি খাতদেশ স্বাধীনের পর পাট, চা, চামড়ার সঙ্গে চিংড়ি রপ্তানি সম্ভবনাময়খাত হিসেবে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তবে নব্বই দশকের পরে এদেশের কিছু অসাধু উদ্যোক্তার কারণে এখাতে বিপর্যয় নেমে আসে। এসব উদ্যোক্তা তারকাঁটা, শ্যাওলা ঢুকিয়ে চিংড়ি রপ্তানি করে ধরা পড়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এদেশ থেকে চিংড়ি রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আবারো আঘাত এসেছে এখাতে। ভাইরাস ছড়ানোর ভয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এদেশে উচ্চ ফলনশীল ভেনামি চিংড়ি চাষে অনুমোদন না দেয়ায় কোনো রকমে টিকে থাকা চিংড়িখাতের বিপর্যয় আরো বেড়েছে।

স্বাধীনতার পর আর্ন্তজাতিক বাজারে এদেশের চিংড়ির চাহিদা বাড়তে থাকে। লাভ দেখে দেশি উদোক্তাদের অনেকে এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতরণ ব্যবসাও বাড়তে থাকে। একে একে ১৪০টি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ খামার গড়ে উঠে। রপ্তানি ও ভেনামি চিংড়ি চাষে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় খামার বন্ধ হতে হতে বর্তমানে ৪৮টি কোনো রকমে টিকে আছে। চিংড়ি খামারের অনেকেগুলো আলু রাখার কোল্ড স্টোরেজ হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরেই ৫ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ চিংড়ি পাওয়া য়ায় ৪৭ দশমিক ৬৩ টন। ওই বছর চিংড়ি রপ্তানি থেকেও সর্বোচ্চ ৫৫০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে চিংড়ির যোগান ও রপ্তানি আয়- দুটোই কমছে। গত অর্থবছর আরও কমে ৩০ দশমিক ৬১ টনে নেমেছে। এবছরে চিংড়ি রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৭৭ মিলিয়ন ডলারে।

কোভিড পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপ-আমেরিকার হোটেল-রেস্তরাতে পুরোপুরি চালু হওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে চিংড়ি রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বাড়লেও কাঁচামাল ভেনামি চিংড়ি সংকটের কারণে চাহিদা সত্ত্বেও রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি। বন্ধ রয়েছে ১৩২টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। সক্ষমতার এক-পঞ্চমাংশ নিয়ে কোন রকমে চালু আছে ৪৮টি কারখানা। অথচ বিশ্বের ৬২টি দেশ বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষ করে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করছে।
এশিয়ার ১৫টি চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বাদে সবাই ভেনামি চিংড়ি চাষ করছে। চলতি বছর এম ইউসি ফুডস, খুলনার পাইকগাছায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের লোনাপানি কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে প্রতি হেক্টরে ৮ দশমিক ৬২ টন চিংড়ি পেয়েছে। অথচ সনাতন পদ্ধতিতে বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ করে হেক্টর প্রতি সর্বোচ্চ ৩৩০ কেজি পাওয়া যায়।

আরও পড়ুনঃ  বাংলাদেশকে পেঁয়াজ কেনার অনুরোধ মোদি সরকারের

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। খুব শিগগিরই আরেকটি সভা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা যায়।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিএফএফএ) সাবেক সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন আনন্দবাজারকে বলেন, স্বাধীনতার পর প্রথম বছরেই চিংড়ি রপ্তানিতে সফলতার চিত্র দেখে কুমিল্লার এক জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান চিংড়িকে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তারপর থেকেই রপ্তানিকারকরা চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে থাকে। ব্যাংকও তখন কারখানা করার জন্য ঋণ দিতে তৎপর হয়ে উঠে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বছরে দেড় লাখ টন চিংড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তখনকার সরকার। তাতে চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিনিয়োগ আরও বাড়তে থাকে। এভাবে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তখনকার মূল্যে প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ১৪০টি কারখানা গড়ে উঠে। এসব কারখানার জন্য বছরে ৪ লাখ টন চিংড়ির প্রয়োজন হতো।

এ ব্যাপারে রপ্তানিকারকরা বলছেন, আর্ন্তজাতিক চিংড়ির বাজারে বাংলাদেশের অংশ কমতে কমতে এখন দুই শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সনাতন পদ্ধতিতে বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষে খরচ বেশি, প্রতি হেক্টরে পাওয়া যায় মাত্র ৩০০ কেজির মতো। ফলে বাংলাদেশে চিংড়ির উৎপাদন খরচ বেশি। প্রতিযোগী দেশগুলো কম খরচে ভেনামি চিংড়ি চাষ করে হেক্টর প্রতি ৯০০০-১০,০০০ কেজি চিংড়ি পাচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  আড়াই টাকার বেগুন ঢাকায় ৫০ টাকা

ফলে তারা তুলনামূলকভাবে অনেক কম মূল্যে বিদেশে রপ্তানি করতে পারছে। রপ্তানি বাজারে অংশ কম হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং এর ওপর মোটেই নির্ভরশীল নয় আমদানিকারকরা। ফলে রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বও কমে গেছে। যে ৪৮টি কারখানা রপ্তানি করছে, তারাও উৎপাদন সক্ষমতার এক-পঞ্চমাংশ ব্যবহার করতে পারছে মাত্র।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ই-পেপার
প্রথম পাতা
খবর
অর্থ-বাণিজ্য
শেয়ার বাজার
মতামত
বিশ্ব বাণিজ্য
ক্যারিয়ার
খেলার মাঠ
প্রযুক্তি বাজার
শিল্পাঞ্চল
পণ্যবাজার
সারাদেশ
শেষ পাতা